অনুবাদ  | অন্যান্য

আইনের দরজায় । মূল : ফ্রানৎস কাফকা অনুবাদ : মোজাফফর হোসেন

আইনের দোরগোড়ায় অপেক্ষমান এক দারোয়ান। এই দারোয়ানের কাছে গ্রাম থেকে আগত এক লোক এসে প্রবেশ অনুমতির প্রার্থনা করে। কিন্তু দারোয়ান বলে যে, সে তাকে ঠিক এই মুহূর্তে ভেতরে ঢুকার অনুমতি দিতে পারছে না। লোকটা ক্ষণিক ভেবে জিজ্ঞাসা করে, খানিক পরে ঢুকতে দেওয়া যায় কিনা। ‘তা সম্ভব’, দারোয়ান বলে, ‘তবে এই মুহূর্তে নয়’। যেহেতু আইনের দরজাটা খোলায় আছে এবং দারোয়ান এক পাশে সরে আছে, উৎসুক লোকটি উঁকি দিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা চালায়। এটা দেখে হেসে উঠে দারোয়ান বলে- ‘যদি তোমার এতই ইচ্ছে হয়, আমার বাধা না মেনে ভেতরে চলে যেতে পারো। তবে মনে রেখ, আমি ক্ষমতাবান। এবং আমি হচ্ছি সবচেয়ে নিচুপদের দারোয়ান। ভেতরে হল থেকে হলে একজন করে দারোয়ান আছে। প্রত্যেকে তার আগের জনের থেকে শক্তিধর। তৃতীয় দারোয়ানের চোখেই আমি চোখ রাখতে পারি না।’ গ্রাম থেকে আসা লোকটি এতসব জটিলতার কথা ভেবে এখানে আসেনি। সে ভেবেছে, নিশ্চয় আইনে সবার সব সময় সমান প্রবেশাধিকার আছে। কিন্তু এখন সে যখন দারোয়ানকে আরও কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করল- ফারের কোট পরা, লম্বা সরু নাক, লম্বা-পাতলা-কালো তাতারদের দাড়ি, সে সিদ্ধান্ত নিল- সে বরং অপেক্ষা করবে। দারোয়ান তাকে একটা মুড়া দিয়ে দরজার একপাশে বসার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। সে ওখানে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বসে কাটিয়ে দেয়। মাঝে সে বেশ কয়েকবার ভেতরে প্রবেশের জন্যে আর্জি করেছে। প্রতিবারই দারোয়ান কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করেছে, জানতে চেয়েছে তার বাড়ি-ঘর সম্পর্কে, আরও অন্যান্য সব বিষয় নিয়ে। এগুলো খালি পদস্ত লোকদের একটু ভাব ধরে কিছু কথা বলার মতোই। এবং প্রতিবারই শেষ করেছে এই বলে যে, এখনও তাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার সময় আসেনি। লোকটি তার ভ্রমণের জন্য যতকিছু সঙ্গে এনেছিল, দামি অদামি সব, আস্তে আস্তে ঘুষস্বরূপ দারোয়ানকে দিয়ে দিল। দারোয়ান প্রতিবারই এটা গ্রহণ করে বলেছে- ‘আমি শুধু এটা গ্রহণ করছি, যাতে তুমি নিজেকে নিজে বলতে পারো সব চেষ্টা তুমি করেছিলে।’ এই অনেকগুলো বছরে দারোয়ানের দিকে লোকটির মনোযোগ প্রায় আটকে গিয়েছিল। সে অন্যান্য দারোয়ানদের কথা ভুলেই গিয়েছিল। এই প্রথম দারোয়ানকেই তার কাছে আইনের পথে মূল বাধা বলে মনে হচ্ছিল। শুরুর বছরগুলোকে সে তার মন্দ ভাগ্যকে গাল-মন্দ করছিল- ভীষণ রেগে আর উচ্চবাচ্যে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে খালি নিজেকে তার অসন্তুষ্টি বিড়বিড় করে জানান দিচ্ছিল। বাচ্চা বনে যায় সে। দারোয়ানকে এতটা কাল ধরে দেখতে দেখতে তার কোর্টে বসা মাছিগুলোও পরিচিত হয়ে ওঠে। মাছিগুলোর কাছেও সে বিনতি করে দারোয়ানের মন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার জন্যে। শেষমেশ তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। সে বুঝে উঠতে পারে না, তার আসে পাশে ঐগুলো অন্ধকার নাকি চোখের ধোকা। তবে ঐ অন্ধকারের ভেতর থেকেই সে উপলব্ধি করতে পারে, আইনের দরজা থেকে একটা অনির্বান দীপ্তি ভেসে আসছে। আর বেশি দিন বাঁচবে না সে। মৃত্যুর আগে, এতদিন ধরে সংগৃতি সকল অভিজ্ঞতা তার মাথায় জড় হয়ে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়- একটা প্রশ্নে যেটা সে এখনও দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করেনি। সে হাত নাড়িয়ে দারোয়ানের দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করে, যেহেতু উঠে দারোয়ানের কাছে যাওয়ার মতো শক্তি আর অবশিষ্ট নেই তার দেহে। দারোয়ানকে এগিয়ে আসতে হল। তাকে ঝুকে আসতে হয় কেননা দুজনের শরীরের উচ্চতার ফারাকে অসুবিধা হচ্ছিল। ‘এখন আবার তুমি কি জানতে চাও? দারোয়ান জানতে চাইল। তোমার তৃপ্তি কোনোদিনই মেটানো সম্ভব না। প্রত্যেকেই তো আইনের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করে’। লোকটি বলল, ‘এটা কি করে সম্ভব হল যে এতকাল ধরে আমি ছাড়া আর কেউ আইনের কাছে যাওয়ার জন্যে এলো না?’ দারোয়ান বুঝতে পারলো যে, লোকটি তার জীবনের চরম সীমায় চলে এসেছে। সে আর ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছিল না, দারোয়ান কানের কাছে চেঁচিয়ে বলল, ‘যেহেতু এই দরজা শুধু তোমার জন্যে তৈরি করা হয়েছিল, সেহেতু আর কেউ ভেতরে ঢুকতে পারত না। আমি এখন এটা চিরকালের মতো আটকে দিতে যাচ্ছি।’

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





মন্তব্য করুন

আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন করুন: