ফিকশনবিশেষ লেখা  | বড়োগল্প

ইসরাফিলের প্রস্থান । খালিদ মারুফ

[এক]

চতুর্দিকে কলেমা শাহাদতের পুনঃপুন আবৃত্তির একটি ভয়ার্ত গীত ছড়িয়ে দিয়ে, পরিজন শববাহকদের কাঁধে রাখা খাটিয়ায় চড়ে ইসরাফিল ভূঁইয়া এগিয়ে যেতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে তাঁর পূর্বপুরুষের নির্ধারিত ও ব্যবহৃত দ্বারহীন উদোম কবরস্থানটির দিকে। আর যেতে যেতে বাতাসের শরীরে মেখে দিয়ে যায় আগরবাতি, কর্পূর ও গোলাপজলের একটি মৃত্যুময় সুঘ্রাণ। যা মূলত ইসরাফিল ভূঁইয়ার মৃত্যুর খবরটা আরো একবার জানিয়ে দিয়ে যায় রাস্তার দু’ পাশে বাড়ি ও ঘরের ভেতর থাকা জীবিত মানুষদের। যদিও তারা সকালে একবার মসজিদের মাইক থেকে বাতাস ফুড়ে ছুটে আসা বাজখাঁই ঘোষণায় জানতে পেরেছে যে, ‘সে আর নেই।’ আর এই মুহূর্তে ইসরাফিল ভূঁইয়ার মৃত্যুর সংবাদের চেয়ে তাদেরকে যে বিষয়টা বেশি বিচলিত করে তা হলো, যখন তীব্র সূর্যালোকে গাছের সবুজ পাতায় আগুন জ্বলে যাবার উপক্রম, ঠিক তখনই অর্থাৎ এমন গনগনে দুপুরে কেনইবা তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও রেখে যাওয়া শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে কবরস্থ করতে তৎপর হয়েছে। শুধু তা-ই নয় বরং খাটিয়ায় তুলে নিয়ে চলেছে মৃত্তিকার বুকে নিখুঁত পরিমাপে খোঁড়া গর্তে তাঁকে পুতে রেখে আসবে বলে।

নাসারন্ধ্রে ঢুকে পড়া গন্ধ ও কর্ণকুহরে প্রবেশ করা অনবসর মৃত্যুগীত রাস্তার দু’পাশের মানুষদের আরো একবার মনে করিয়ে দেয় ইসরাফিল ভূঁইয়াকে। তাতে তাদের মধ্যে যে সকল প্রতিক্রিয়া হয় সেগুলো হলো, বাড়িতে অবস্থান করা পুরুষ ও নারীরা তাদের নির্ধারিত বসতীর সীমানা ছাড়িয়ে রাস্তার নিকটে এসে গণ্ডদেশ স্ফীত করে এবং নারীরা নাক ও মুখে আঁচল চেপে অ¯পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করে ‘আহারে!’ এছাড়া তাদের মধ্য থেকে শুধু স্ত্রীলোকেরা ছাড়া পুরুষ ও বালক-যুবাদের কেউ কেউ খাটিয়ার পিছু পিছু শবযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। হয়তো তারা ইসরাফিল ভূঁইয়ার কবরে মুঠো মুঠো এঁটেল মাটি ছুড়ে দেবার লোভ সংবরণ করতে পারে না বলেই অন্যান্য শবযাত্রীর সাথে কবরস্থানের দিকে ধাবিত হয়।

শবযাত্রাটি যখন লোকালয় ছেড়ে ফসলি মাঠের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু রাস্তাটি অতিক্রম করে, তখন দু’ পাশের মাঠে কর্মরত চাষাদের অনেকেই হাতের কোদাল ও কাস্তে ছেড়ে দু’ হাত কোমরে ঠেকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও যাদের হাতে লাঙল ছিল তারা অল্প কিছুক্ষণের জন্য তা গুটিয়ে ফেলে উঠে আসে মাঠের কিনারায় প্রাচীন বটগাছটার ছায়ার নিচে।

যেখানে তাদের রেখে যাওয়া হুঁকোর আগুন ততক্ষণে নিভু নিভু করছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ যারা অতি প্রত্যুষে মাঠে চলে আসার কারণে ইসরাফিল ভূঁইয়ার মৃত্যু সংবাদ হতে বঞ্চিত হয়েছে তাদের মধ্য থেকে কেউ একজন চিৎকার করে জানতে চায়, ‘এ… কিডা মরলো রে?’ প্রতিউত্তরে একটি শোকাহত কণ্ঠ তাকে জানিয়ে দেয় ‘দুলোভাই, বলে থেমে গিয়ে আবার বলে, ‘দুলোভাই, ইসরাফিল দুলোভাই’! যদিও উত্তরটা ঠিক কে দেয় তা সেই মুহূর্তে সনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

মূলত ইসরাফিল ভূঁইয়া তাঁর বিবাহের পরপরই নিজগ্রামের পিতৃভিটা পরিত্যাগপূর্বক শ্বশুরবাড়িসূত্রে পাওয়া বাজারের পশ্চিম পার্শ্বের বৃহদাকার একখণ্ড জমির উপরে সারিবদ্ধ সুপারি গাছ আর গজিয়ে ওঠা আগাছার ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে নিজ বসতবাড়ির গোড়াপত্তন করেছিল।

মৃত্যু পূর্ববর্তী কয়েকটি বছর সে তাঁর এই বাড়িতেই অতিবাহিত হয়। এছাড়াও এই বাড়িতেই সে তাঁর বিভিন্ন ছুটির অবসরে যাওয়া-আসার ফাঁকে স্বীয় স্ত্রীর গর্ভে চার চারটি সন্তান উৎপাদন করে, যাদের মধ্যেকার দু’ জন, যারা তাঁর পুত্র সন্তান ছিল তারা নিশ্চয় আছে এই শবযাত্রায়, হয়তো তারা তাদের পিতার খাটিয়ায় কাঁধও লাগিয়ে থাকবে। এই গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রামটিতেই ছিল তাঁর শ্বশুরালয়, তাই তাঁর বাড়ির পেছন থেকে শুরু হয়ে যেখানে লোকালয় শেষ হয়েছে অর্থাৎ যেখান থেকে বিলের হয়েছে শুরু, সেই পর্যন্ত, প্রায় সকল বাড়ির প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের নিকটই সে ‘ইসরাফিল দুলোভাই’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এবং সদ্য মরে যাওয়া ইসরাফিল ভূঁইয়ার সাথে তারা তাদের সম্বন্ধ এখনো ছিন্ন করে নাই।

তাঁর শবযাত্রাটি কিছুক্ষণ আগে যখন বাজারের প্রধান রাস্তাটি অতিক্রম করছিল তখন সেখানে একদল উঠতি বয়েসিকে দেখা যায় হাস্যোজ্জ্বল। তারা কী ইসরাফিল ভূঁইয়ার মৃত্যুতে সন্তুষ্ট হয়ে হাসছিল নাকি হাসছিল এমনিতেই তা বোঝা না গেলেও এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ইসরাফিল ভূঁইয়ার মৃত্যু তাদের হৃদয়ে কোনো প্রকার শোকাচ্ছন্নতার জন্ম দেয় নাই বা দিতে পারে নাই। তবে ইসরাফিল ভূঁইয়ার নিঃসাড় শরীরের নিচের মানুষেরা তাঁর মৃত্যুতে ঠিক কী কী ধরনের সংবেদনে ভুগছে সাদা কাফনে মোড়া বিবস্ত্র ইসরাফিল ভূঁইয়া হয়তো তাঁর কিছুই জানতে পারছে না, বা জানলেও তাদের ভাবনা ও তৎপরতায় তাঁর আর কিছুই আসে যায় না। সে হয়তো ভাবছিল অতজোরে বিকট খিস্তিটা না করে উঠলেই তো পারা যেত।
মৃত্যু পূর্ববর্তী কয়েক মাসব্যাপী তাঁর পরিবারের সদস্যরা ও ইতোপূর্বে সাক্ষাৎ হওয়া সকল চিকিৎসকসহ প্রায় সকলেই তাকে যে সাধারণ পরামর্শগুলো দিয়ে যাচ্ছিল তা হলো চিৎকার করে কথা না বলা, উত্তেজনা পরিহার করা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানো। তবে চির অবাধ্য ইসরাফিল ভূঁইয়া তাদের কারো কথাই রাখতে পারে নাই বা রাখে নাই। যদিও একটি সুপ্ত আরোগ্যবাসনা তাঁর অন্তরে ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়, কেননা প্রথমদিনের প্রচণ্ড বুক ব্যথা ও যুগপৎ মাথাব্যথায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবার পর সে যখন কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে তখন তাঁর স্ত্রীর নিকট থেকে সিন্দুকের চাবি নেয়।
এবং সিন্দুক খুঁজে তাঁর সামরিক জীবনে পাওয়া সাস্থ্যসেবা কার্ডটি বের করে এবং সে ঢাকায় গিয়ে এই কার্ড দেখিয়ে সমর হাসপাতাল প্রদত্ত সেরা চিকিৎসাটি গ্রহণ করবে ও দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবে বলে সকলকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু চুরি হয়ে যাওয়া জীবনে তাঁর এই সাধটিও অপূর্ণ রয়ে যায়। এই বাসনা ও সকল বিধিনিষেধ ভেতরে চেপে রেখে তাঁকে নিয়মিতই দেখা যায় তাঁর পরিচিত স্বল্প মেদের নাদুস-নুদুস অনাবৃত শরীরে, কোমরে শখের গামছাটা পেঁচিয়ে রাতে ও দিনে যথারীতি হেঁটে ও চিৎকার করে বেড়াতে। তবে তাঁর এ চিৎকার যতক্ষণ অব্যাহত থাকত ততক্ষণ অপরপক্ষ থেকে উচ্চ অথবা অনুচ্চ হাসি কিংবা অধঃউচ্চারিত কিছু শ্লেষ ছাড়া কোনো হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া কখনো দেখা যায় নাই। এটা শুধু তাঁর সারাদিনের বাজার ভ্রমণ ও কালেভদ্রে অন্যত্র অর্থাৎ ফসলের মাঠে কৃষকদের কাজের তদারকি ও মসজিদ আঙিনার নিয়মিত জমায়েতের ক্ষেত্রেই কেবল সত্য। তাঁকে একটি অভিযোগ করতে শোনা যায়। এমনকি একথা সত্যও যে, তাঁর পরিবারের সকল সদস্য যারা হিসেব মতে তাঁরই পোষ্য হয়েও তাঁর নিরঙ্কুশ আধিপত্য মেনে নেয় নাই, উপরন্তু কখনো কখনো তারা তাদের পিতা কিংবা স্বামীরূপী এই ইসরাফিল ভূঁইয়ার সাথে মারাত্মক তর্কে লিপ্ত হয়েছে ও অবাধ্য হয়েছে।

তবে এও সত্য যে, ইসরাফিল ভূঁইয়া কারণে অকারণে সকলের ওপরেই চড়াও হয়েছে। তাঁর এই আক্রমণে ইসরাফিল ভূঁইয়া সর্বদাই প্রতিপক্ষের গায়ে যা ছুঁড়ে অথবা মাখিয়ে দিয়েছে তা হলো তাঁর গর্বিত সৈনিক জীবনে শিখে আসা নানা কটূগন্ধযুক্ত অশ্রাব্য ও অপসম্বন্ধ নির্দেশক শব্দ ও বাক্যাবলি। যেহেতু সে ছিল অধিকাংশের নিকট একজন ‘দুলোভাই’ এবং স্বল্প সংখ্যক অতি বৃদ্ধের নিকট একজন জামাতা আর অল্প বয়েসিদের নিকট দাদা-নানা অথবা ভাই। সেটাই হতে পারে প্রতিআক্রমণের হাত থেকে তাঁর রক্ষা পাবার প্রধানতম কারণ। এছাড়া ইসরাফিল ভূঁইয়ার উৎকট উত্তেজনা ও বিকট চিৎকারের পশ্চাতে অন্যতম কারণ হিসেবে যা জানা যায় তা হলো, তাঁর এই সকল শ্যালক কিংবা ভাই ও নাতিরাই তাকে ডেকে অনাবশ্যক অপছন্দের কোনো প্রসঙ্গ তুলে তাকে বাধ্য করেছে ঐরূপ আচরণে। আর ছিল একটা কারণ যা তাকে একই সাথে আক্রমণে প্রলুব্ধ ও প্রতি আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করত। এছাড়াও যেটা অনুমান করা যায় যে, এই নাপাক ভ‚মিতে জন্ম নেওয়া ইঁচড়ে পাকাদের দল তাঁর সকল খিস্তি খেউড়ের মধ্যে কিছুটা আনন্দ ও নতুনত্ব খুঁজে পেত।

[দুই]

যাইহোক, সেটা সম্ভবত উনিশশো বাষট্টি, কিংবা তেষট্টি সালও হতে পারে। যখন ইসরাফিল ভূঁইয়া ছিল তল্লাটের সর্বাপেক্ষা সুদর্শন ও মনোহর যুবক, সুদর্শন বলতে তাই অর্থাৎ যে সব নান্দনিক দেহ সৌকর্যের অধিকারী হলে একজন ব্যক্তিকে সুদর্শন বলা যায় ইসরাফিল ভূঁইয়া ছিল তাই। কখনো কখনো তাঁর চেয়েও কিছুটা বেশি যেমন, সে এতটাই বলশালী ছিল যে, পুরো তল্লাট বলতে আশেপাশের উনিশটি গ্রামের তাবৎ নামকরা সকল কুস্তিগীরকেই সে ইতোপূর্বে ন্যূনতম একবার করে হলেও শীতের শুকনো ও বর্ষার আর্দ্র মাটিতে ছুড়ে ফেলেছে নির্বিকার। হয়তো এ জন্যই সে ক্রীড়া হিসেবে কুস্তিতে আর মজা পায় নাই। কুস্তির বদলে সে তখন হা-ডু-ডুকেই বেছে নেয় নিজের শক্তি ও ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে। হা-ডু-ডু খেলায় সে যখন তাঁর দীর্ঘ দম গলায় আটকে রেখে বিপক্ষদলের নির্দিষ্ট চৌহদ্দিতে আসত কেউ একজন সক্রিয় খেলোয়াড়কে নিশ্চিত কিয়ৎক্ষণের জন্য এক নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করে চৌহদ্দির বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে, তখন দু’ একটি বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া প্রায় সবসময়েই সে সফল হতো।

এ কাজে কখনো কখনো এমন হতো যে, বিপক্ষের প্রায় সকল খেলোয়াড় একযোগে তাকে আটকে রাখার জন্য ঘিরে ধরত ও তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং পরমুহূর্তে যে দৃশ্য দেখা যেত তা ছিল এরকম: প্রতিপক্ষের ঝাঁপিয়ে পড়া খেলোয়াড়দের মধ্য হতে দু’ জন ছিটকে পড়ত সীমানার বাইরে, দু’ জন গড়াগড়ি দিত নিজ সীমানার মধ্যে। অবশিষ্টরা তাঁর ঘাড়ে চড়ে’ উরুতে লেপ্টে ও গোড়ালিতে ঝুলে থেকে ইসরাফিল ভূঁইয়ার সাথে নিজ সীমানা ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসত ইসরাফিল ভূঁইয়ার সীমানায়।

তারপর অনেকক্ষণব্যাপী হাততালি চলতে থাকত। সেই সময় তারই জন্মদাতা পিতা তাঁর এই উদ্দাম, উপভোগ্য ও দুর্দান্ত জীবন থেকে তাকে উপড়ে নিয়ে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করাতে তৎপর হয়, অথবা যুবক ইসরাফিল ভূঁইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর পিতা এমন একটি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ইসরাফিল ভূঁইয়া ¯পষ্ট ভাষায় তাঁর অপারগতা জানিয়ে দিয়ে যাপিত জীবনকে উপভোগ করতে থাকে। যদিও সেটা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কেননা ইসরাফিল ভূঁইয়ার পিতা এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন যে, একদিন প্রত্যুষে সে ঘুমন্ত থাকতেই তাঁরই আপন অন্য তিন চাচা সহযোগে তাকে বিছানায় পাকড়াও করে যদিও চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা তাকে আটকে রাখতে সক্ষম হয় না। এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে ইসরাফিল ভূঁইয়া যখন বাড়ির সীমানাও ছাড়িয়ে যায়, তখন তাঁর নাছোড়বান্দা ছোট চাচার হাতে কেবল পেঁচিয়ে থাকে তাঁর গায়ের বসনটারই একটি ছেড়া অংশ। অতঃপর তারা দুপুর পর্যন্ত ইসরাফিল ভূঁইয়ার পশ্চাদ্ধাবনে লিপ্ত থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা তাকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। দোর্দণ্ড ইসরাফিল ভূঁইয়াকে তাঁর পিতা এবং পিতৃবংশের প্রায় সকলে মিলে কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় যখন মাঠ থেকে ধরে নিয়ে আসে। তখন তাঁর ঠোট বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। যদিও তাঁর সমগ্র মুখমণ্ডলে এতসব বিষয়ের কোনো দুঃখবোধ, ক্লান্তি, হতাশা অথবা অনাহারজনিত ক্ষুধা, কিছুই পরিলক্ষিত হয় না। পরের দিন সকালে যখন তাঁর মায়ের রাত্রিব্যাপী ক্রন্দন ও পিতৃবাৎসল্যের ফলশ্রুতিস্বরূপ তাঁকে গোয়ালের পেছনের প্রাচীন আমগাছটার সাথে বেঁধে রাখা দশা থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তখন সে গোসল করে। কারও সাথে কোনোরূপ বাক্যালাপ ছাড়াই মায়ের ক্রন্দনভেজা চোখগুলোর দিকে একবারও না তাকিয়ে প্রাতঃরাশ শেষ করে। রাত্রিব্যাপী সমগ্রশরীরে মশার হুল ও জোঁকের চুম্বনে তৈরি ক্ষতস্থানগুলোতে তাঁর মায়ের তৈরি চুন ও হলুদের লেই গায়ে না মেখে বাড়ি থেকে পুনরায় বেরিয়ে যায়। যাবার সময় তাঁরই সমবয়েসি গ্রামের আরো কয়েক যুবককে দেখা যায় তাঁর সঙ্গী হতে। এ সময়ে তাঁর পিতা বারান্দায় বসা থাকলেও তাকে কোনোপ্রকার বাধা দেয় না।

[তিন]

সেদিন রাতে তাঁর সাথে বেরিয়ে যাওয়া যুবকদের মধ্য হতে তিন জনই ফিরে এসে জানায়, ইসরাফিল ভূঁইয়া আর্মিতে যোগ দিয়েছে। তারা আরো জানায়, ইসরাফিল ভূঁইয়াকে ট্রেনিংয়ের জন্য পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে খবরটা মুহূর্তে তাঁর গোটা পরিবারকে এক সমুদ্র আনন্দে ভাসিয়ে দিলেও সে আনন্দের ঝাপটা ভেতর বাড়িতে থাকা তাঁর মায়ের চোখ দুটোকে প্লাবিত করে। এরপর অনেক বছর তাঁর আর কোনো খোঁজ-খবর পাওয়া না যায় না। ইসরাফিল ভূঁইয়ার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি তাঁর নির্দয় পিতার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। কখনো সে দূর বহু দূরের কোনো গ্রামে যেখানে কেউ একজন হয়তো আর্মিতে চাকরি করে এমন খবরের ভিত্তিতে সেখানে চলে যায় যদি বা তাঁর অপ্রিয় পুত্রের কোনো সন্ধান মেলে। সন্ধান মেলে না। ইসরাফিল ভূঁইয়ার মা ছেলের সন্ধান পেতে ছাগল মানত করে। গণক-গুণীন আর কবিরাজের বাড়ির উঠোনে বসে থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা। তাঁর সুঠামদেহী পিতা যেন রাতারাতি বুড়িয়ে যায়। হাঁপানি বেড়েই চলে তাঁর। এমনি এক দিনে কেউ একজন গোয়াইন ঘাটের বিখ্যাত গুণীনের সন্ধান এনে দেয়। তিন দিনের রাস্তায় হাঁটা পথে ইসরাফিল ভূঁইয়ার পিতা রওনা হয় পুত্রের সন্ধান পেতে। যেতে যেতে তাঁর পিতা অন্য অনেকের সাথে কথাবার্তায় জানতে পারে পাক-ভারত উত্তেজনার খবর। সে তাদেরকে তাঁর গুণীনের কাছে যাবার উদ্দেশ্য বর্ণনা করে। শ্রবণপূর্বক সকলে ‘হু’ এবং ‘আহা’ বলে ইসরাফিল ভূঁইয়ার নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার দুঃখে সামিল হয়। তিন দিন হেঁটে তাঁর পিতা গুণীনের বাড়িতে পৌঁছতে সক্ষম হলেও সেই মহান গুণীনের সাক্ষাৎ পেতে তাকে আরো দু’দিন অপেক্ষা করতে হয়। সকল অপেক্ষার শেষে পঞ্চম দিন সন্ধ্যায় ইসরাফিল ভূঁইয়ার পিতা যখন গুণীনের পা স্পর্শ করে তখন গুণীন তাঁর মাথায় হাত রাখে এবং জানিয়ে দেয় ইসরাফিল ভূঁইয়া এখন হিন্দুস্তান সীমান্তে পাকিস্তানের পাহারায় রত আছে। সে ভালো আছে। এবং সে শীঘ্রই ফিরবে। এই আশায় ইসরাফিল ভূঁইয়ার পিতার হাঁপানিগ্রস্ত পিঞ্জর একহাত স্ফীত হয়। পুত্রের দ্রুত ফিরে আসার সমাচারে পিতার পায়ের গতি প্রায় দ্বিগুণ হয় এবং তিন দিনের পথ সে দু’ দিনে পাড়ি দিয়ে যখন ফিরে আসে তখন সন্ধ্যা ঘনায়মান।

বাড়ির সীমানায় পৌঁছতেই আগরবাতির কড়া গন্ধ আর উচ্চ-নিচ নানান লয়ে বিলাপের সুর এসে প্রবেশ করে ইসরাফিল ভূঁইয়ার পিতার কানে। পায়ের গতি ধীর হয়ে আসে তাঁর।

বাড়ির নিকটবর্তী হলেই বৃদ্ধের আর বুঝতে বাকি থাকে না, স্ত্রীবিয়োগ ঘটেছে তাঁর। কবর তৈরি হয়। বর্ষায় সে কবর ধ্বসেও যায়। আত্মজালা আগাছার রাশি ঢেকে ফেলে সেই কবর, তবু সে ফিরে আসে না।

তাঁর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি গ্রামে রেখে যাওয়া বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-দূরাত্মীয়দের মাঝে যে অনুমান, এমনকি যে বিশ্বাস তৈরি করে তা হলো: ইসরাফিল ভূঁইয়া পাকিস্তান ও ‘হিন্দুস্তান’ সীমান্তে শিখসেনাদের সাথে গুলি বিনিময়ের সময় মৃত্যুবরণ করেছে কিংবা তাঁর প্রিয় কওমের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে স্বীয় জীবন উৎসর্গপূর্বক ‘শহিদ’ হয়েছে, তবে এ খবরের কোনো সত্যতা পাওয়া যায় না। কারণ কেউই এমনকি পুলিশ বা ঐরূপ কোনো কর্তৃপক্ষ তাঁর মরদেহ বাক্সে পুরে ফেরত নিয়ে আসে না। তাঁর পিতা এইসব সরল অনুমানের তোয়াক্কা না করে তাঁর ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। তাদের এই অপেক্ষা শেষ না হতেই চলে আসে সেই ‘মহা দুর্যোগের’ বছরটি। যখন সমগ্র তল্লাটের সাথে তারাও অর্থাৎ ইসরাফিল ভূঁইয়ার গ্রামের সবাই এতটাই অনিরাপদ, বিচলিত ও হতবাক হয়ে পড়ে যে, তারা সবাই হা-ডু-ডু ও কুস্তির কথা বেমালুম বিস্মৃত হয়। এমনকি তারা ভুলে যায় ইসরাফিল ভূঁইয়াকেও। তারা ভুলে যেতে বাধ্য হয়। কেননা তাদের যে সকল দানা-শস্য ঘরে উঠি-উঠি করছিল তাঁর প্রায় সবটাই জমিতে নষ্ট হয়ে যায়। আর যে সব ফসল বর্ষার শুরুতেই রোপার কথা ছিল সে ক্ষেত্রেও তারা ভূমিকে দেয়া তাদের কথা রাখতে সক্ষম হয় না।

সমগ্র গ্রামের সমর্থ সকল যুবা-পুরুষের অনেকেই বর্ষার প্রারম্ভে রাজাকার আর খানসেনাদের গুলি ও জবাইয়ের শিকার হয়ে মারা পড়ে, পানিতে তাদের মৃতদেহগুলি ভেসে যায়। যেতে যেতে পচে ফুলে ওঠে। কাকেরা সেইসব গলিত দেহের ওপর দাঁড়িয়ে ভাসতে থাকে। ঠোঁট দিয়ে খুঁচিয়ে পচা চামড়া ছিদ্র করে, হয়তো খায়, অথবা দেহের অভ্যন্তরের স্বল্প পচা নাড়ি-ভুঁড়ির সন্ধানে আরো গভীরে ঠোঁট প্রবেশ করায়। বাকিরা পাকসেনাদের হাত থেকে বাঁচতে ও হিন্দুদের বাঁচাতে নদীর পাড়ে, যেখানে কামান ও মেশিনগানবাহী গানশিপ ভিড়তে পারে সেই জায়গায়। সুউচ্চ এক বাঁশের আগায় পাকিস্তানের নিশান উড়িয়ে তার নিচে বৃদ্ধ ও কিছু সুললিত কণ্ঠের শিশুকে নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন কুরান পাঠের আসর তৈরি করে। আর যারা আরো বেশি ‘শান্তিপ্রিয়’ তারা উদ্যোগ নিয়ে হিন্দুদের সকল সম্পদের দেখা-শোনার কথা দিয়ে তাদেরকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেয়। এছাড়াও অনেক মা তাদের ছাত্র ও মজুর সন্তানদের কোনোভাবেই চোখের জল দিয়ে আটকে রাখতে পারে না। তাদের কেউ কেউ তাদের মায়ের চোখের জলের কানাকড়ি মূল্য না দিয়ে, অনেকে আবার মায়ের সাথে দেখাটাও না করে অথবা দেখা করার সুযোগ না পেয়ে কোথায় যেন পালিয়ে যায়। যদিও পরে জানা যায় তারা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে।

যুদ্ধ শেষে তাদের অনেকেই যখন লম্বা দাড়ি গোঁফে মুখ ঢেকে কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে ফেরত আসে তখন, যারা ফেরত আসে না তাঁদের মায়েরা বিলাপহীন ভেজা চোখ নিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরতে থাকে। শোকে বিহ্বল ইসরাফিল ভূঁইয়ার পিতা স্ত্রীবিয়োগ আর হারিয়ে যাওয়া বেয়াড়া পুত্রের শোকে আরো বেশি হাঁপানি ও অন্যান্য জ্বরায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আর গ্রামের সেই হারিয়ে যাওয়া দলটির কেউ কেউ কোনো দিন ফেরত না এলেও ইসরাফিল ভূঁইয়া ঠিকই একদিন ফেরত আসে।

তবে ইসরাফিল ভূঁইয়া যখন ফিরে আসে তখন সকল দেশত্যাগী হিন্দুরাও স্রোতের মতো ফিরে আসতে থাকে। ফিরে আসা এইসব হিন্দুর দল যখন তাঁদের গচ্ছিত রাখা সকল অস্থাবর, মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণালংকার ইত্যাদি ফেরত না পেয়ে ও ফেলে যাওয়া ঘর বাড়ির পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া অবস্থা দেখতে পায়, তখন তারা সেইসব ছাইয়ের গাদার সামনে ও পুড়ে যাওয়া খুঁটির দণ্ডায়মান অবশিষ্টাংশ জড়িয়ে ধরে এমন বিকট কান্নাকাটি শুরু করে যে, বাকিরাও তাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে ইসরাফিল ভূঁইয়ার ফিরে আসার বিষয়টি তাঁর পিতা ও নিকটাত্মীয় ছাড়া বাইরের লোকদের খুব বেশি আশ্চর্য করে না। সবই এত বড় খবরে কেবল ‘ও আচ্ছা’ আর ‘ভালো’ বলে প্রতিক্রিয়া জানায় এমনকি বিষয়টা যেন খানিকটা চাপা পড়ে যায়। সুতরাং ইসরাফিল ভূঁইয়ার ফিরে আসার দিনগুলি কিছুটা নীরবেই কেটে যেতে থাকে।

এই সময়ে সে তাঁর কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবকে খুঁজতে গিয়ে না পেয়ে নিরাশ হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, ‘শালার পুতেরা মনে হয় যুদ্ধে গিয়া মরছে।’ যদিও সে তাঁর বাল্যবন্ধুদের কেউ কেউ যেমন আহিল উদ্দিনের পুত্র ফুটবলার শেখ ইয়াকুব আলি, ছায়েল উদ্দিনের কনিষ্ঠ পুত্র কৃষক ও হা-ডু-ডু খেলোয়াড় আবদুল আলি, ঘরামি নকিউল্লার জ্যেষ্ঠপুত্র কাঞ্চন, বৃদ্ধ খোরশেদ মুন্সির মেঝ ছেলে শখের মৌয়াল তৈয়ব আলি, এন্তাজ উদ্দিনের একমাত্র পুত্র গাছে চড়তে পারঙ্গম মোবারকসহ প্রায় আঠারো-কুড়িজন পরিচিতের সন্ধান পায় বড় মাদ্রাসার পেছনে ঘাসে ঢাকা মাটির স্তূপের নিচে। গ্রামের লোকেরা তাকে জানায়, বর্ষার মাঝামাঝি এক সোমবার সকালে শহর থেকে কাসেম মওলানা একদল খানসেনাকে সাথে নিয়ে গ্রামে ঢুকে মাঠ ও বাড়ি থেকে তাদের প্রত্যেককে ডেকে এনে জবাই করে। দ্বিখণ্ডিত দেহগুলোকে মাদ্রাসার পেছনে ফেলে দিয়ে দুপুরের আগেই আবার শহরে ফিরে যায়। যাদের শোকস্তব্ধ মায়েরা প্রত্যহ সকালে ওই মাটির স্তূপ ঘিরে আহাজারি করতে থাকলেও সেইসব হত্যা-মৃত্যু ইসরাফিল ভূঁইয়াকে এতটুকুও স্পর্শ করে না।

[চার]

যেহেতু তাঁর পিতা ও অন্যান্যেরা এতটা দীর্ঘ প্রতীক্ষা, উপরন্তু একটি যুদ্ধ শেষে তাকে ফিরে পেয়েছে, তাই তারা এতসব কিছুর ভেতরেও খানিকটা সুখবোধ করে। তাকে পুনরায় হারিয়ে ফেলার ভয় হতে মুক্তি পেতে ইসরাফিল ভূঁইয়ার বিবাহের উদ্যোগ গ্রহণ করে। হতবুদ্ধি, আশাহত ও বিরক্ত ইসরাফিল ভূঁইয়া এই দিনগুলো একা একাই কোথাও শুয়ে অথবা বসে থেকে পার করার চেষ্টা করছিল। এই সময়, এই মাত্র যখন তাঁর খাটিয়াবাহী স্বজনেরা তাকে বয়ে নিয়ে প্রাচীন বটগাছটা অতিক্রম করে সরু রাস্তায় প্রবেশ করেছে, সেদিন সে এই বটগাছটার নিচেই বসেছিল। তাঁর মনে হচ্ছিল ডুবন্ত সূর্যের মৃদু আলোর সাথে সবুজ বটের মোটা মোটা পাতাগুলো যেন সূর্যকে বিদায় দেয়ার এক তাচ্ছিল্যপূর্ণ খেলায় মেতে উঠেছে। তখন ইসরাফিল ভূঁইয়া লক্ষ করে, দূর থেকে মাঠ পেরিয়ে একটি ছায়ামূর্তি হেঁটে যেন তাঁর দিকেই আসছে। ছায়ামূর্তিটা নিকটবর্তী হয়। সে দেখে একজন দূরবর্তী হাট ফেরত মানুষ ক্রমশ ¯পষ্ট হয়ে উঠছে। যার মাথায় বিশাল আকৃতির বাজারের ডালা যদিও তা আকৃতির সাথে মিলিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ ভারী নয় বলে তাঁর অনুমান হয়। হাট ফেরত ব্যক্তি আরও নিকটবর্তী হলে ইসরাফিল ভূঁইয়া তাঁকে চিনতে পারে। অত্যন্ত ভালোভাবেই ইসরাফিল ভূঁইয়া তাকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এই সেই অঘোর মাঝি! প্রতিটি পদক্ষেপে যে ইসরাফিল ভূঁইয়ার স্মৃতিতে দগদগ করে ফুটে উঠতে থাকে। সে ছিল শীর্ণকায় এবং এখনো সে তাই আছে। শীর্ণকায় এই অঘোর মাঝির দ্বারাই একমাত্র সম্ভব হতো ইসরাফিল ভূঁইয়াকে বিপক্ষ দলের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে ফেলা বা ধরে রাখা।
তারপর ইসরাফিল ভূঁইয়া নিজেকে মুক্ত করতে যখন দানবীয় লম্ফ-ঝম্প শুরু করে, ততক্ষণে অঘোরের দোহারেরা ঝুলে পড়ে অঘোরেরই দু’ পায়ে। নিজেকে মুক্ত করতে ইসরাফিল ভূঁইয়া যে লাফগুলো দিতে বাধ্য হয় তাতে অঘোর একবার শূন্যে উঠে আসে। একবার ডানে আছড়ে পড়ে, আরেকবার বাঁয়ে। কিন্তু তাতে অঘোরের মুষ্টিশৃঙ্খল শিথিল হয় না এতটুকুও। এবারের করতালিটা যেন ইসরাফিল ভূঁইয়ার মাথার ভেতরে বাজতে থাকে। থামে না। বাজতেই থাকে। ইসরাফিল ভূঁইয়াকে উন্মাদ করে দেয় সে করতালি আর হর্ষধ্বনি।

অঘোর এসে দাঁড়ায় তাঁর সামনে। ইসরাফিল ভূঁইয়া দেখে অঘোরের ঠোঁট চিবুক ও দাঁতে খেলে যাচ্ছে এক শব্দহীন মৃদুহাসি যা ভীষণ প্রশান্তির। যেন দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর তাঁর ফিরে আসা বন্ধুকে সে এক্ষুনি আলিঙ্গনাবদ্ধ করবে। বসে থাকা ইসরাফিল ভূঁইয়ার সামনে অঘোর এসে দাঁড়ায়। হাসি অক্ষুণ্ন রেখেই জানতে চায়–
‘কেমন আছো ইসরাফিল ভাই?’
এই জলের মতো সহজ ও পরিষ্কার প্রশ্নটাই যেন ইসরাফিল ভূঁইয়ার মাথার ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেয়। উত্তর আসে–
‘যেমনই থাকি তাতে তোর কী হারামির বাচ্চা মালাউন!’
এবং শেষের শব্দটা একটু আস্তে ও কিছুটা দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করা কণ্ঠে বললেও অঘোরের সতর্ক কান তা শুনে ফেলে, একটুও দমে না গিয়ে হাসি অক্ষুণ্নরেখেই অঘোর বলে–
‘দ্যাহ ইসরাফিল ভাই, দ্যাশ এহন স্বাধীন হইছে, কথায় কথায় মালাউন কইবা না।’
‘কি কইলি শুয়োরের বাচ্চা চাড়াল।’

বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়ায় ইসরাফিল ভূঁইয়া। ততোধিক দ্রুততায় একাধিক চড় সে বসিয়ে দেয় অঘোরের হাসি মেলে রাখা মুখ ও শীর্ণ কাঁধে। ছিটকে পড়ে অঘোর মাঝি। ছিটকে পড়ে তাঁর মাথায় রাখা বাজারের ডালাসহ। ইসরাফিল ভূঁইয়ার ভেতরে টগবগ করতে থাকা রক্তধারা শিথিল হয়ে আসে। অন্যত্র যাবার জন্য পা বাড়ায় সে। কিছুদূর গিয়ে একবার পিছু ফিরে দেখে ভ‚লুণ্ঠিত স্বাধীন অঘোর মাঝি তাঁর রাইফেল চালানো কঠিন হাতের চড়গুলোকে ইতোমধ্যেই হজম করে নিয়েছে। ঘাসের ভেতর ছড়িয়ে পড়া আলু, পটল ও বেগুন একটা একটা করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তারপর স্বাধীন দেশের সেই কর্মহীন দিনগুলো তাঁর কেটে যেতে থাকে একের পর এক আকস্মিকতায়। এই সময়েই ইসরাফিল ভূঁইয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

পার্শ্ববর্তী জলাভ‚মিপীড়িত গ্রামের বেশিরভাগ মৎস্যজীবী মানুষের মধ্যে একমাত্র সম্ভ্রান্ত ও মূলত সেই গ্রামের সকল সিদ্ধান্তের অধীশ্বর ও জীবনবিধানসমূহের একমাত্র ব্যাখ্যাকারক হাজী ইউসুফ আলীর মেজ কন্যার সাথে তাঁর বিবাহ হয়। সে ঐ ব্যক্তির কন্যাকেই বিবাহ করে যে যুদ্ধের সময়টাতে কওমের পক্ষে লড়াইরত ধর্ষকদের সাথে কোনো একটি রফা করে। হতে পারে কোনো বড় উপঢৌকনের বিনিময়ে। কওমের পতাকা নিজ বাড়িতে ও বাড়ির সামনের মসজিদে ঝুলিয়ে রেখে বিপুল অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, খুন, নারী ধর্ষণ ও অপহরণের হাত থেকে তাঁর নিজ গ্রাম ও গ্রামের মানুষদের বাঁচিয়ে রাখে।

ইসরাফিল ভূঁইয়ার বিবাহের কিছুদিনের মধ্যেই, এক শুক্রবার দুপুরে মসজিদ থেকে ফিরে তাঁর হাঁপানিগ্রস্ত পিতা দুপুরের খাবার শেষ করতে না করতেই হাত পা ছড়িয়ে সেখানে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করে। মুখ থেকে বগলে ওঠা শ্লেষ্মা ছড়িয়ে পড়ে তাঁর পাকা দাড়িতে। তাকে বিছানায় তুলে শুইয়ে দেয়া হয়। তাঁর চারপাশে বাড়ির সকল স্ত্রীলোকেরা মিলে সমস্বরে কুরান পাঠের মাধ্যমে যমদূত অথবা মৃত্যুকালীন যন্ত্রণা ঠেকাতে একটি রক্ষাব্যূহ তৈরি করে। তাতে অল্প কিছুক্ষণ অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা যমদূতকে তারা ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়, তবে বিকেলের আগেই ইসরাফিল ভূঁইয়ার ধর্মানুগ পিতা বার কয়েক বিশাল জিহ্বা বের করে খিঁচুনি দিয়ে ইহলোকের পাঠ চুকিয়ে বিদায় হয়।

একই সাথে বিবাহের মতো একটি আনন্দময় ও পিতৃবিয়োগের মতো তুমুল বিয়োগান্তক ঘটনা ইসরাফিল ভূঁইয়াকে আরো বেশি একাকী ও ক্ষিপ্ত করে তোলে। এই সময় থেকে সে প্রায় সকলের ওপরেই নিয়মিত চড়াও হতে থাকে। যে শান্তিপন্থি ব্যক্তির মেঝ কন্যার সাথে তাঁর বিবাহ হয়, তাঁর নাম ছিল আকলিমুন্নেসা। সে ছিল ইসরাফিল ভূঁইয়ার দেখা লাহোর-করাচির সেনা কর্মকতাদের স্ত্রী-কন্যা ও অন্যান্য রমণীদের প্রায় বিপরীত।


আকলিমুন্নেসার গাত্রবর্ণ এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে, তাকে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা মৎসজীবী গ্রামের পরিবারসমূহের মধ্যে ফর্সা বলে রায় দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আর উচ্চতায় আকলিমুন্নেছা এতটাই খর্বাকৃতির ছিল যে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে কেবল ইসরাফিল ভূঁইয়ার রোমশ বুকটাই দেখতে পেত। যদিও দিনের আলোকময় অংশে স্বামীর দেখা সে ক্বচিৎই পেয়েছে। পক্ষান্তরে ইসরাফিল ভূঁইয়াই ছিল তাঁর কোম্পানির একমাত্র পূর্ববঙ্গীয় ফৌজ। যে সহজেই মিশে যেতে পারত পাঞ্জাব ও বালুচ সেনাদের সাথে। বর্ণে, উচ্চতায় ও দৃঢ়তায়।

তাই মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তারা একসাথে থাকলেও খুব বেশি বনিবনা তাদের মাঝে ছিল না বলেই জানা যায়, আরও যেটা জানা যায় ইসরাফিল ভূঁইয়ার বয়ানে তা হলো: তাঁর আকলিমুন্নেসা না¤œী এই স্ত্রীর যোনিদেশ ছিল শুকনো নিরস কাঠের শরীরে খোদিত গর্তের মতো। সঙ্গমের সময় যা ভিজে উঠতে সময় নিত অনেক। আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার সে তার আর্দ্রতা হারিয়ে প্রায় পূর্বের মতোই একটি শুকনো এঁটেল মাটির বুক খুড়ে তৈরি গহ্বরে পরিণত হতো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন তাদের প্রথমে পাঞ্জাবি সেনাদের কাছ থেকে আলাদা করে নজরবন্দি ও পরে পুরোপুরি বন্দি করে রাখা হয়, তার পূর্ব পর্যন্ত সে তাঁর কো¤পানির সাথে অবস্থান করছিল উত্তর পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী একটি সেনা ছাউনিতে। এর পাশেই ছিল আটকে পড়া স্বাস্থ্যবান শিখ নারীদের দিয়ে তৈরি একটি উৎকৃষ্ট বেশ্যালয়, সেখানকার সকল নারীই ছিল অবিশ্রাম রসালো, সারাদিন তাদের কাছে আসা সৈন্যদের প্রত্যেককে আলাদা-আলাদা করে ভিজিয়েও তাদের যোনির রস শেষ হতো না। ইসরাফিল ভূঁইয়া সেই নারীদের কোনো দিন ভুলতে পারে নাই।

পিতৃবিয়োগের শোক ও অতৃপ্ত সঙ্গমে কেটে যেতে থাকা দিনগুলোর মধ্যেই একদিন সে একটি চিঠি পায়। চিঠিতে স্বাধীন দেশের পুনর্গঠিত সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। সে এই ডাকে সাড়া দিয়ে নতুন সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যায়। ইসরাফিল ভূঁইয়া বাড়ি ছেড়ে যাবার কিছুদিনের মধ্যেই আকলিমুন্নেসা তাঁর প্রথম কন্যা সন্তানটির সফল জন্মদানে সক্ষম হয়। তারপর থেকে তাঁর স্ত্রী তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ কুক্ষিগত করেছে বলে ইসরাফিল ভূঁইয়াকে পরবর্তী জীবনে অভিযোগ করতে শোনা যায়। এমনকি ইসরাফিল ভূঁইয়া অবসর গ্রহণের পর গ্রামে ফিরে যখন আর একটি বিবাহের জন্য উতলা ও উদ্যোগী হয়ে ওঠে, তখন তাঁরই সেই শীর্ণকায় স্ত্রীর ষড়যন্ত্রে উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। হয়তো এ কারণেই ইসরাফিল ভূঁইয়ার অর্জিত সকল স্থাবর ও অস্থাবর এবং উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত সব স¤পদ ও স¤পত্তি কোনো না কোনো ছলা-কলায় আকলিমুন্নেছা নিজ নামে মালিকানা হস্তান্তর করে নেয়। কার্যত এই ঘটনার পর থেকেই ইসরাফিল ভূঁইয়াকে দেখা যায় পারিপার্শ্বিকতার ওপর আরো বেশি ক্ষিপ্ত ও অসহায় হয়ে পড়তে। যদিও এ অভিযোগ তৈরি হবার পূর্বেই সে আকলিমুন্নেসার গর্ভে চার চারটি সন্তান দিয়ে তাঁকে ধন্য করেছে। অথচ কী আশ্চর্য! তাঁর সন্তানেরা কেউই তাঁর সমগ্র জীবনে তাঁর দেওয়া কোনো আদেশ-উপদেশ ও নিষেধের তোয়াক্কা করে নাই। তবে এদেরই প্রথম জনের প্রথম কন্যাটি ইসরাফিল ভূঁইয়ার সার্বক্ষণিক ক্ষ্যাপাটে জীবনের শেষ ভাগের কিছুটা সময়ের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল।

[পাঁচ]

যদিও সেই সময় একদিন সদ্য বুনি ওঠা এক দুধ বিক্রেতা কিশোরী গিয়েছিল দুধের পাত্রসমেত ইসরাফিল ভূঁইয়ার বাড়িতে। কিছুক্ষণ পর যখন মেয়েটি তাঁর ডান হাতে শূন্য দুধের পাত্র ও বাম মুঠিতে কিছু খুচরো টাকাসহ ইসরাফিল ভূঁইয়ার সদ্য তোলা দ্বিতীয় দালানটির দেয়াল ঘেঁষে সন্ত্রস্ত দৌড়ে বের হচ্ছিলো, তখন মেয়েটির নরম গাল কান্নার জলে ভেজা ছিল বলে অভিযোগ তুলে ছোকড়ার দল হাসাহাসি করে। তবে এই হাসাহাসি বা নিন্দা ও ঠাট্টা সবই ঘটে ইসরাফিল ভূঁইয়ার অগোচরে।
এইসব অগোচরেই ঘটতে হবে কেননা ছোকড়ার দল শুনেছে এবং তাদের পিতারা সবাই সে ঘটনা চাক্ষুষ দেখেছে। ইসরাফিল ভূঁইয়া গ্রামে ফেরার পর যখন বাজারের চতুর্পার্শ্বের গ্রামগুলোতে ঘন ঘন ডাকাত হানা দিচ্ছিলো, সেই সময় প্রায় প্রতি রাতেই বাজারের বড় বড় মোকামওয়ালা ও গ্রামের মাঝারি সম্পদশালীদের সাথে দিনহীন নিঃস্বরাও ভয়ে কাঁপতো ঠক ঠক করে। এমনই এক রাতে সকলের ভীতিকে বাস্তবে পরিণত করে সত্যি সত্যি বাজারে একদল সংঘবদ্ধ ডাকাত আক্রমণ করে। ডাকাতের দল অন্ধকারে ট্রলার ছেড়ে বিদ্যুৎগতিতে উঠে আসে ও দু’ দলে ভাগ হয়ে প্রথমে তারা বাজারের একমাত্র ব্যাংকের মরচে ধরা লৌহদরজা কেটে কিংবা ভেঙে প্রহরীর বন্দুক কেড়ে নিয়ে তাঁকে বেঁধে রেখে এগিয়ে যায় সিন্দুকের দিকে, আর অন্য দলটি একই সময়ে বাজারের অন্যপ্রান্তে অর্থাৎ যে প্রান্তে ইসরাফিল ভূঁইয়ার বাড়ি তাঁর পাশেই সর্ববৃহৎ মুদিখানার স্বত্বাধিকারী বোরহান শিকদারের দোকান লাগোয়া বাড়িতে হানা দেয়। এবং ডাকাতদলের এই আগ্রাসন ঐ পর্যন্ত এসে থেমে যায়। প্রথমে একটা গুলির শব্দ শোনা যায় যাতে আশেপাশের ঘুমজড়ানো মানুষেরা জেগে ওঠে। তবে গুলির শব্দে তারা সন্ত্রস্ত না হয়ে যেন খানিকটা আশ্বস্ত ও সাহসী হয়ে ওঠে।

আলো ফোটার আগেই ভীত পায়ে এগিয়ে আসা এলাকাবাসী বোরহান শিকদারের উঠোনে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা যে লাশটির দেখা পায়। তা ঐ ডাকাত দলের সর্দারের ছিল বলে পরবর্তীকালে তারা আবিষ্কার করে। সেইরাতেই কিছু মানুষ ইসরাফিল ভূঁইয়ার সাহসে সাহসী হয়ে এগিয়ে এসে ব্যাংকের অভ্যন্তরে চারজন ডাকাতকে আটকে ফেলে ও পাকড়াও করে। এবং শেষ রাত থেকে শুরু করে সেদিন দুপুর পর্যন্ত তারা ইসরাফিল ভূঁইয়াকে দেখতে পায় সর্বোচ্চ নিষ্ঠুর চেহারায়। উন্মত্ত ইসরাফিল ভূঁইয়া ধৃত চার ডাকাতের ওপর লোহার রড ও বড় বড় সব গরানডালের নির্যাতন অব্যাহত রেখেছিল ততক্ষণ, যতক্ষণ না সূর্য তাঁর সর্বশক্তি নিয়ে মধ্যাকাশে উঠে এসে উত্তাপ ছড়াতে থাকে। ইসরাফিল ভূঁইয়া যখন বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্ত নদীতে গোসল করে বাড়ি ফেরে তার কিয়ৎক্ষণ পূর্বেই সে লোহার রড ও তর্জনীর সহয়তায় ধৃত চার ডাকাতের আটটি চোখই উপড়ে ফেলে অথবা গুলিয়ে দেয়। সে সব যেহেতু অনেক আগের কথা তাই ছোকড়ার দলের কাছে এসব নেহায়েতই গল্প। তবে এ ঘটনার পর থেকে বাজারের ও গ্রামের নানা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসাসভায় নিয়মিতই আমন্ত্রণ পেতে থাকে ইসরাফিল ভূঁইয়া। যদিও এগুলো সে কখনো উপভোগ করেছে বলে কারো মনে হয় না কেননা প্রায় সকল সভাই তাকে মাঝ পথে বর্জন করতে দেখা যায়। আরো যেটা দেখা যায় তা হলো: বাদি-বিবাদি কারো প্রতি নয় বরং সভার অন্য কোনো সভ্যের উপর সে ক্ষিপ্ত হয়ে গর্জন করতে করতে সভাস্থল ত্যাগ করছে।

ইসরাফিল ভূঁইয়ার প্রধানতম দুঃখাবলির মধ্যে এটাও ছিল অন্যতম যে ‘হিন্দুস্তানি ষড়যন্ত্রে’ পাকিস্তান ভেঙে পড়ার পূর্বে সে মাত্র দুই কি আড়াই টাকায় সর্বোচ্চ সুন্দর ও ভালো লুঙ্গিটা খরিদ করতে পারতো। অথচ আজ তাই এমনকি ঠিক তাও না বরং গুনে মানে তার চেয়ে অনেক খারাপ ও নিম্নমানের একটি লুঙ্গি সে কিনতে বাধ্য হচ্ছে দু’ শ, আড়াই’শ কি তিন’শ টাকায়। ইসরাফিল ভূঁইয়ার দুঃখসমূহ শুধু এখানেই নয়, আরো যেগুলো ছিল তা হলো: এক টাকা মজুরিতে মাত্র একটি ডাকে যেখানে দশজন মজুর এসে হাজির হতো তাঁর পিতার বাড়ির উঠোনে সেখানে এর বিপরীতে কী হচ্ছে এইসব? কাজের মানুষ অর্থাৎ দিনমজুর তা হোক কৃষিজমির জন্য, কিংবা তাঁর বাড়ির চারপাশে বেড়া নির্মাণ ও জঙ্গল পরিষ্কারের জন্য, পাওয়াই যায় না বলা চলে। আর যাদের পাওয়া যায় তারা মজুরি হাঁকে তিন শ’ থেকে চার শ’ টাকা। এছাড়াও তাদের নানামুখী আবদার ও অনুযোগে বড় বিরক্ত হয়ে এই গতকাল পর্যন্ত ইসরাফিল ভূঁইয়াকে বলতে শোনা গেছে, ‘হারামজাদার দল কাজের জন্য হাজির হবে বেলা দশটায় যেন তারা অফিস করতে আসে, দুপুরের খাবারটাও দিতে হবে ইসরাফিল ভূঁইয়াকে। তাও আবার যেনতেন খাবার নয়, পান্তা খাওয়া তো হারামির বাচ্চারা ভুলেই গেছে, ছোটলোকগুলো তাই খাবে যা ইসরাফিল ভূঁইয়া নিজে খায় আর কমতি পড়লে দুর্নাম রটাবে নির্ভয়ে।’ সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছোটলোকের দল সব হাত পা গুটিয়ে উঠে আসবে মাঠ থেকে, গোসল করবে একে একে তাঁরই যত্নে বাঁধানো পুকুরের ঘাট নোংরা করে, সে একাধিকবার যদিও তাদেরকে এখানে গোসল করতে নিষেধ করেছে কিন্তু তারা তা আমলে নেয় নাই। মজুরিটাও চাই হাতে হাতেই এবং নিয়েই তারা চলে যাবে কোনোপ্রকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছাড়াই। আর সন্ধ্যার পর এইসব ছোটলোক ও ছোটলোকের বাচ্চারা কোমরে ফুল প্যান্ট চড়িয়ে গায়ে উড়ন্ত শার্ট লাগিয়ে একগাল মিষ্টি পানসহ হাজির হবে কোনো এক ভিসিয়ার প্রদর্শনীতে কিংবা কোনো গান অথবা ততোধিক অশ্লীল কোনো আড্ডায়। পাকিস্তান বিগত হবার পর এইসব অব্যবস্থাপনা বড়ই পীড়িত করে তুলেছিল ইসরাফিল ভূঁইয়ার মৃত্যু পূর্ববর্তী দিনগুলোকে। কখনো কখনো সে ক্ষিপ্ত হয়ে এদের কারো ওপর চড়াও হয়েছে। এবং ডেকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ‘তোর বাপ-দাদা আট আনার লুঙ্গি কোনোদিন কোমরে জড়াইতে পারে নাই, গামছা ছিল তাদের পরিধেয়! আর তুই লাগাইছিস ফুল প্যান্ট।’ এছাড়াও আরো যে সব সতর্কবার্তা সে তাদের শোনাতো তা হলো, ‘ছোটলোকের বেশি বাড়াবাড়ি ভালো নয়।’ কেননা শেয়ালের দ্বারা কোনো দিন সম্ভব নয় বাঘকে আটকে রাখা। তবে তাঁর এই সকল খিস্তি ও সাবধান বাণী যাদের উদ্দেশে তারা কেউ কখনই এগুলো কানে তোলে নাই। ইসরাফিল ভূঁইয়ার এইসব বচনের প্রতিউত্তরে ছোটলোকেরা তাকে যা ফেরত দেয় তা একগাল লাল দাঁতের হাসি ও হৃদয় গহ্বর থেকে উদগিরিত গাঢ় বিড়ির ধোঁয়া। আফসোস করে ইসরাফিল ভূঁইয়া বলে উঠত, ‘সেই শাসন যদি আজ থাকত!’

প্রথমবার স্ট্রোকটা হয়ে যাবার পর থেকেই ইসরাফিল ভূঁইয়া তাঁর শয্যায় আর স্ত্রী আকলিমুন্নেছাকে গ্রহণ করে নাই। এমনকি তাঁর পাশে ঘুমাতেও দেয় নাই। সে নিজেও ঘুমাতো খুব অল্প, হয়তো বিষিয়ে উঠেছিল তাঁর মন ও শরীর। শেষ দিকে সে প্রায় সারারাতই জেগে থাকতো। ঘুমের বদলে হেঁটে বেড়াত বাজারের রাস্তায়। কখনো একা, কখনো বা বাজারের পাহারাদারকে সাথে নিয়ে, আর একদমই কাউকে পাওয়া না গেলে বাজারের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো হতো তাঁর নির্ঘুম ও নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী।

আজ সকালে যখন ধেয়ে আসা সূর্যটা বাগানের গাঢ় ছায়াকে সরিয়ে দিয়ে অবস্থান নেয় ইসরাফিল ভূঁইয়ার টিনের চালে, তখন কোনো এক গভীর ষড়যন্ত্রের বশবর্তী হয়ে তাঁর মাথার উপর ঘুরতে থাকা ইলেকট্রিক পাখাটাও থেমে যায়। যেহেতু এই সময়ে তাঁর স্ত্রী অন্যান্য সময়ের মতোই তাঁর পাশে ছিল না তাই সে ঘরের বদ্ধ গরমে ঘেমে একেবারে নেয়ে উঠে বিছানা ছাড়ে। ঘর থেকে বেরিয়ে সে চাপকলের শানবাঁধা চত্বরে হুটোপুটি করতে থাকা শিশুর দলটিকে একদফা গালমন্দ করে যখন তাড়িয়ে দেয়, তখন তাঁর খেয়াল হয় গোসলের জন্য সেখানে একটি বালতি ও মগ রাখা থাকলেও প্রধান অনুষঙ্গ গামছাটাই সে বিছানা ছাড়ার সময় নিয়ে আসতে ভুলে গেছে। ‘মাগি গেলি কই!’ বলে চিৎকার করে করে সে যখন আর কারোই সাড়া পায় না, তখন নিজেই উদ্যোগী হয়ে কলপাশ ছেড়ে এগিয়ে যায়। আঙিনা পাড়ি দিয়ে ভেজা পায়ে গৃহে প্রবেশের প্রথম সিঁড়িটায় নিজের বা’পাটা তুলে দ্বিতীয় পদক্ষেপের জন্য যখন উদ্যত হয়, তখনই ঘটে যায় দুর্ঘটনাটা। ইসরাফিল ভূঁইয়া মুখ থুবড়ে পড়ে যায় কংক্রিটের সিঁড়ির ওপর। মাথার ভেতর তাঁর হাজার ভোল্টের একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ যেন শুরু হয়। উফ! কী নির্মম অচেনা এই যন্ত্রণা। এটা কী এত বছরব্যাপী তাঁর মাথার ভেতরেই সংরক্ষিত ছিল? না। তবে কে ঢোকালো এই ভয়ানক তড়িৎবেদনা তাঁর মাথার ভেতর? দু’ হাতে ভর দিয়ে নিজের শরীরটাকে সে উল্টে নিতে সক্ষম হলেও দু’ টি পায়ের একটিও সে আর নাড়াতে পারে না। মাথাটা কিঞ্চিৎ উঁচু করে নিয়ে ইসরাফিল ভূঁইয়া নিজের পা’গুলোর দিকে তাকায় একবার। বোঝার চেষ্টা করে তাঁর পা’গুলোকে মালাউন অঘোর মাঝিই তালুবদ্ধ করলো কিনা। তাঁর দুর্বিনীত পদযুগল আটকে রাখার শক্তি আর দুঃসাহস তো কেবল অঘোর মাঝিই অর্জন করেছে। কিন্তু না, আঘোর মাঝি তো এখানে নাই। সে বুঝতে পারে তাঁর শক্তিশালী পদযুগল নিজেরাই আজ তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেছে। মুহূর্তে সে আরো টের পায় তাঁর বাজখাঁই গলার শব্দগুলো যেন গলাতেই আটকে যাচ্ছে। সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে সে শুধু গো-গো জাতীয় কিছু অনুচ্চারিত শব্দ তৈরিতে সক্ষম হয়। অনুভব করে আপনা থেকে ফাঁকা হয়ে আসা তাঁর দুটি ওষ্ঠের দু’ পাশে দলা দলা থু-থু শক্ত ফেনা হয়ে জমে উঠেছে। তাঁর পিতার মৃত্যুর সময় যেমনটা হয়েছিল। তবে তাঁর তো হাঁপানি ছিল, ইসরাফিল ভূঁইয়ার তা নেই। তবে কি তাঁর বমি আসছে? ইসরাফিল ভূঁইয়া বুঝতে পারে না। ঝাপসা হয়ে আসা চোখে সে শুধু দেখতে পায় কারা যেন তাঁর ভ‚পাতিত শরীরটা ঘিরে ছোটাছুটি করছে। সে শুনতে পায় একটি কচিকণ্ঠ বেশ জোরের সাথে উদ্বেগ জড়ানো স্বরে বলছে, ‘কিভাবে ধরবো নানা যে হাইগা দিছে।’ এই কণ্ঠটা কার? তাঁর প্রিয় নাতনির, নাকি কন্যার? নাকি চির অপ্রিয় স্ত্রীর? সে বুঝতে পারে না। ইসরাফিল ভূঁইয়া বুঝতে পারে সমাগত মৃত্যু তাঁকে বিভ্রান্ত করছে, তবে কি সে মরে যাচ্ছে? হ্যাঁ, সে নিশ্চয় মরে যাচ্ছে। তখনও পর্যন্ত উন্মিলিত দুটি চোখে এখন আর লাল-লাল আভা ছাড়া সে আর কিছুই দেখছে না। পরক্ষণে তাঁর মনে হয় যেন বিশালাকার কোনো নদী, যার ওপার দেখা যায় না। আর এই লাল হল সেই নদীতে বয়ে যাওয়া রক্তস্রোত, এটা কোন নদী? ইসরাফিল ভূঁইয়া চিনে উঠতে পারে না। তাঁর মনে হয় এটা বোধহয় ঝিলম, না! রাভিই হবে, না! তাও না, এইসব নদী এত রক্ত পাবে কোথায়? তবে কি পদ্মা, নাকি ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁও হতে পারে কেননা রক্তস্রোত বুকে ধারণ করার অভিজ্ঞতা তো শুধু এদেরই, এই অসনাক্ত রক্তের নদীতে সে ভেসে থাকে আরো কিছুক্ষণ, তারপর ডুবে যায়।

ইসরাফিল ভূঁইয়ার ঘটনাবহুল জীবনের মতোই দ্রুততায় শেষ হয় তাঁর শবযাত্রা। সর্বশেষ যে ব্যক্তি তাঁর মৃতদেহের পাশ থেকে উঠে আসছিল সে আবার উপুড় হয়ে তাঁর মুখের দিকের কাফনের বাঁধনটি খুলে দিয়ে মাথাটাকে ঘুরিয়ে ঈষৎ পশ্চিমমুখি প্রতিস্থাপন করে উঠে আসে। আর সে উঠে আসার পরপরই সেখান থেকে সমস্বরে ধ্বনিত হতে থাকে, ‘মিনহা খালাকনাকুম, অফিহা নূঈদিকুম, অমিনহা নূখরিজুকুম, তা রাতান উখরা।’



খা লি দ   মা রু ফ

জন্ম ১০ আগস্ট ১৯৮৫, বেশরগাতী, বাগেরহাট
প্রকাশিত বই:
ইস্রাফিলের প্রস্থান [গল্প]
শীতার্ত পৌষ অভিমুখে [উপন্যাস]
পেশাগত অবস্থান: সহব্যবস্থাপক
বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১০০০ ।
ই-মেইল : archedia2013@gmail.com

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





মন্তব্য করুন

আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন করুন: