ননফিকশন  | সাধারণ প্রবন্ধ

বিশ্বসাহিত্যে অনুগল্প । ভূমিকা, অনুবাদ ও সম্পাদনা : মোজাফফর হোসেন

অনুগল্প বা ফ্লাশফিকশন

অনুগল্প বা ফ্লাশফিকশন সম্প্রতি সাহিত্যের জনপ্রিয় শাখা হয়ে উঠেছে। গত পাঁচ বছর ধরে ব্রিটেনের সাহিত্যজগতে ‘ন্যাশনাল ফ্লাশফিকশন ডে’ উদযাপিত হয়ে আসছে। নিউজিল্যান্ডেও অনুরূপভাবে জাতীয় অনুগল্প দিবস পালিত হয়। স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের বিপ্লব, ফেসবুক-টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর জনপ্রিয়তায় বর্তমানে গল্পের এই ক্ষুদে কাঠামো বা ফর্মটি নিয়ে হৈ চৈ হলেও এটি একেবারে নতুন কিছু না- মুখে মুখে বলা গল্প-ঐতিহ্যে (ওরাল ট্রাডিশন) বহু যুগ থেকে চলে আসছে। পশ্চিমে ঈশপের গল্প, ভারতবর্শে জাতক কিংবা লোকমুখে প্রচলিত গোপাল ভাড়ের গল্পও আকারে বেশ ছোট ছিল। গ্রিম ভাইদ্বয় যে ফোক-টেলস সংগ্রহ করেছিলেন তার বেশির ভাগই ছিল অনুগল্পের আকারে। এসব গল্পে সংক্ষিপ্ত আখ্যানে গুটিকতক চরিত্র ও ঘটনার ভেতর দিয়ে গল্পটি শেষ হয়।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে অনুগল্পের প্রধানতম লেখক হলেন বনফুল (১৮৯৯-১৯৭৯)। বর্তমান বিশ্বে অনুগল্প লিখে ‘ম্যান অব বুকার’ পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন লেখক লিডিয়া ডেভিস (জ. ১৯৪৭)। ডেভিসের গল্পের দৈর্ঘ্য এক লাইন থেকে শুরু করে দু-তিন পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তার গল্পকে আদর্শ অনুগল্প বা ফ্লাশফিকশন বলা যায়। ছোটগল্পের পাশাপাশি অনুগল্প লিখে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন আরেক মার্কিন কথাসাহিত্যিক রবার্ট ওলেন বার্টলার (জ. ১৯৪৫)। তবে বার্টলার এবং ডেভিসের অনেক আগে ছোটগল্পের পাশাপাশি অনুগল্প লিখে বিখ্যাত হয়েছেন জাপানের প্রথম নোবেলজয়ী লেখক Yasunari Kawabata (১৮৯৯-১৯৭২)। অনুগল্প লিখেছেন কাফকা, হেমিংওয়ে, আর্থার সি ক্লাক, রে ব্রাডবুরি, নগিব মাহফুজ, ডোলান্ড বার্থলেম, আমব্রুস বিয়ার্স, কেট শপা, শেখবের মতো প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকরাও।

উল্লেখ্য যে, অনুগল্প সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে আমেরিকায়। সেখানে অনুগল্প এখন ছোটগল্প থেকে কিছুটা সরে এসে সাহিত্যের স্বতন্ত্র বিভাগ (genre) হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু হয়েছে।
অনুগল্পে বেঁধে দেওয়া কোন আকার না থাকলেও কেউ কেউ মনে করেন এটি ১০০ শব্দের মধ্যে শেষ হওয়া চায়, আবার কেউ কেউ ১ হাজার শব্দের নিচে যে কোনো গল্পকে অনুগল্প বলে মনে করেন। যেমন আমেরিকান কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১৮৯৯-১৯৬১) প্রায় নয়শ শব্দে ‘ক্যাট ইন দ্য রেইন’ অনুগল্পটি লিখেছেন; আবার তিনি একটি অনুগল্প লিখেছেন মাত্র ছয় শব্দে : ‘For sale: baby shoes, never worn.’ আবার হন্ডুরাসের লেখক Augusto Monterroso (১৯২১-২০০৩) ‘সাত শব্দের এপিক’ বলে বিখ্যাত ডাইনোসর গল্পটি লিখেছেন : ‘Upon waking, the dinosaur was still there’। প্রখ্যাত মেক্সিকান লেখক এডমান্ড ভালাদেস (১৯১৫-১৯৯৪) বারো শব্দে লিখলেন দ্য সার্চ গল্পটি : Those maddened sirens that howl roaming the city in search of Ulysses। একটা অসমাপ্ত বাক্য, কিন্তু গল্প! তবে অনুগল্প নিয়ে যেন একটু বাড়াবাড়িই করে ফেললেন মেহিকোর লেখক Guillermo Samperio (জ. ১৯৪৮)। তিনি ‘Fantasma’ নামে একটি গল্প লিখলেন যেখানে শিরোনামের পর একটিও শব্দ লেখা হয়নি। শিরোনাম আর একটি খালি পৃষ্ঠা!

অনুগল্পের এই শব্দসীমাকে চীনা সাহিত্যে বেঁধে দেয়া হয়েছে ‘স্মোক লং’ ফিকশন বলে। অর্থাৎ একটি সিগারেট শেষ করতে যে সময় লাগবে তার ভেতর এ গল্প শেষ হয়ে যাবে। এটিকে মাইক্রো ফিকশন, পোস্টকার্ড ফিকশন, ন্যানো ফিকশন, সাডেন ফিকশন, সুপার শর্ট ফিকশন কিংবা শর্ট শর্ট স্টোরি নামেও ডাকা হয় বিভিন্ন দেশে।

অনুগল্পে অল্পকথনের ভেতর দিয়ে অনুভবের বিষয়টি উঠিয়ে আনা হয়। প্রখ্যাত ফরাসি কবি বোদলেয়ার (১৮২১-১৮৬৭)-এর মতো অনেক কবি ক্ষুদে গদ্য-কবিতা (prose poetry) লিখেছেন যেগুলোকে অনুগল্প হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। অন্যদিকে হালের জনপ্রিয় মার্কিন কবি ও গল্পকার স্টুয়ার্ট ডাইবেক (জ. ১৯৪২)-এর অনেক অনুগল্প গদ্য-কবিতা হিসেবে কবিতার কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, কবিতা এবং ছোটগল্প দু’য়ের বৈশিষ্ট্যই অনুগল্পে বিদ্যমাণ। যে কারণে মার্কিন কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওয়াটস (জ. ১৯৩৮) বলছেন, অনুগল্প ‘often more temperamentally akin to poetry than to conventional prose, which generally opens out to dramatize experience and evoke emotion; in the smallest, tightest spaces, experience can only be suggested।’

কবিতার মতো অনুগল্পকে নানামাত্রিক অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করা যায়। একটি কাব্যিক দ্যোতনা বা ভাবমুদ্রা এখানে থাকে। ভাষা হয় ঘন, রূপকাশ্রিত। ফলে মার্কিন কবি ও কথাসাহিত্যিক গ্রেস পালে (১৯২২-২০০৭) বলছেন, ‘অনুগল্প কবিতার মতোই ধীরে পড়া উচিত।’ অন্যদিকে অনুগল্প গল্পের মতোই সমাজ বাস্তবতার কোনো সুপ্ত চেতনাকে ইঙ্গিত করে। চরিত্র থাকে, কথোপকথন (ডায়লগ) থাকে। একটা চমৎকার সমাপ্তিও থাকে। কেবল বলাটা হয় দ্রুত- বিদ্যুৎ চমকের মতন ঝলক দিয়েই শেষ। এক মুহূর্তে বর্ণিত বাস্তবতার এক ঝলক দেখে নেয়া।

অনুগল্পের সঙ্গে গল্পের মূল পার্থক্যটা হল, গল্প তৈরি হয় কতগুলো মুহূর্ত নিয়ে; এখানে কতগুলো ঘটনা কতগুলো দৃশ্যকে আশ্রয় করে প্রকাশ ঘটে। আর একটি সার্থক অনুগল্পে একটি বিশেষ মুহূর্ত একক দৃশ্যপটের ভেতর দিয়ে উপস্থাপিত হয়। কিছু পরিষ্কার করে বলা হবে না, কেবল একটা ইঙ্গিত দিয়েই ছেড়ে দেয়া হবে। উপন্যাস এবং ছোটগল্পের সঙ্গে তুলনা করে আর্জেন্টিনার কথাসাহিত্যিক লুইসা ভেলেনজুয়েলা (জ. ১৯৩৮) বলছেন : ‘I usually compare the novel to a mammal, be it wild as a tiger or tame as a cow; the short story to a bird or a fish; the micro story to an insect (iridescent in the best cases)।’

ফ্লাশফিকশন শরীর গঠনে ‘পোকা’ সদৃশ হওয়ার কারণে শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে অতি মিতব্যয়ী হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের গল্পে টানটান উত্তেজনা থাকবে। শুরু হতেই শেষ হয়ে যাবে। ছোটগল্পের শেষে চমক (whip-crack end) থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে, তবে অনুগল্পে সেটি মৃদুভাবে থাকলে ভালো হয়। যেমন : বনফুলের ‘নিমগাছ’ গল্পে বনফুল নিমগাছের উপকারী দিকগুলো এবং মানুষের তার প্রতি যে নিষ্ঠুর আচরণ করে সেটি বলতে বলতে হঠাৎ করে থেমে গল্পকথক বলে দিলেন, পাশের বাড়ির বৌটিরও একই দশা। গল্প শেষ। এটা মৃদু চমক। ধাক্কাটা আরো তীব্রভাবে এসেছে আর্জেন্টিনার কথাসাহিত্যিক Julio Cortázar (১৯১৪-১৯৮৪)-এর Continuity of the Parks গল্পে। এখানে এক ব্যস্ত ব্যবসায়ী একটি উপন্যাস পড়ছেন তন্ময় হয়ে। উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে নায়ক-নায়িকা পার্কে দেখা করছেন। আসার সময় গাছের ডালের আচড়ে নায়কের মুখে কেটে গেছে। নায়িকা কিস করে রক্তপাত বন্ধ করছে। নায়ক বলছে এভাবে আর লুকিয়ে দেখা করতে পারবে না। এবার কিছু একটা করা উচিত। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিলো আজই নায়িকার স্বামীকে তারা দুজনে মিলে খুন করবে। পরিকল্পনা মতো নায়িকার বাড়ি গেল। দরজায় কুকুর ছিল তাদের দেখে ডাকল না। সামনে হল রুম, তারপর করিডোর, তারপর একটা সিঁড়ি। চাকু হাতে প্রেমিক। প্রেমিকার স্বামী তখন চেয়ারে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে একটি উপন্যাস পড়ছেন। গল্প শেষ। অর্থাৎ শুরুতে যে ব্যবসায়ী পাঠক গভীর মনোযোগের সাথে উপন্যাস পড়া শুরু করেছিলেন। তিনি উপন্যাসটি শেষ করতে না করতেই স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমের বলি হচ্ছেন। বাস্তব আর ফিকশন মিশে এক হয়ে গেল। মজাটা এখানেই।

২.

অনুগল্পের একটা বড় অংশ লেখা হয়েছে ‘কথারূপক বা ফেবল’ ও ‘উপরূপক বা প্যারাবল’ হিসেবে। মোটাদাগে ফেবলের সঙ্গে প্যারাবলের পার্থক্য হল, ফেবলে সরাসরি হিউম্যান বা মানবচরিত্র থাকে না, কিন্তু প্যারাবলে থাকে। বর্তমান গদ্যে সংকলিত গল্পগুলোর মধ্যে জেমস থার্বার রচিত ‘খরগোশ, যারা সকল সমস্যার কারণ ছিল’ গল্পটি আধুনিক ফেবল। রচনাকাল আগস্ট ২৬, ১৯৩৯। সাধারণত ফেবলের চরিত্ররা হয় জীবজন্তু বা পশুপাখি। এই গল্পের চরিত্ররা হল খরগোশ, নেকড়ে ও প্রতিবেশি অঞ্চলের জীবজন্তুরা। লেখক মানবজগতের কোনো বিশেষ বিষয় বা দিক তুলে আনতে এ ধরনের গল্প লিখে থাকেন। সাধারণত এ ধরনের গল্প শিশুদের জন্য লেখা হয়ে থাকে। তবে বড়দের জন্যও কেউ কেউ ফেবল লিখে থাকেন। যেমনটি জেমস থার্বার করেছেন। সমাজ বা রাষ্ট্রের কিছু বিষয় সমালোচনা করার জন্যে প্রতীকী উপস্থাপনের পথ বেছে নেন। ফেবলের সব সময় একটা নীতিবাক্য বা মোরাল থাকে। এ গল্পের মোরালে বলা হয়েছে- run, not walk, to the nearest desert island. গল্পটির আরো অনেক অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। এটি লেখা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাককালে। গল্পকার থার্বার হয়ত খরগোশ বলতে জার্মানির ইহুদিদের বুঝিয়েছেন। আর নেকড়েরা হল নাজি। কিংবা খোরগোশদের সঙ্গে উনিশ শততে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের তুলনা চলে। ক্ষমতাসীনরা হল নেকড়ে। আরও ব্রডভাবে বিশ্বের যেকোনো সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুর অবস্থাকে খরগোশের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আর সংখ্যালঘুরা হল নেকড়ে। গল্পটিকে সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় এলিগরি হিসেবেও দেখার সুযোগ আছে। পৃথিবীর বহু ধর্ম ও ক্ষুদ্র ভাষাভাষি নৃগোষ্ঠী খরগোশদের মতো কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে।

প্যারাবলের যথার্থ উদাহরণ হল এখানে সংকলিত কাফকার ‘আইনের দরজায়’ গল্পটি। কাফকা বড় গল্পের পাশাপাশি বেশকিছু প্যারাবল রচনা করেছেন। ‘বিফোর দ্য ল’ বা ‘আইনের দরজায়’ গল্পটি কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসে আছে। উপন্যাসের মূল চরিত্র কে প্রিস্টকে গল্পটি শোনায়। আইনের দরজায় প্যারাবলে একটি লোক জ্ঞান অর্জন করতে চায় এবং আইনের কাছে আসতে চায়। কিন্তু আসতে দেওয়া হয় না। সে অপেক্ষা করতে করতে মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে জানতে পারে, আইনের এই দরজাটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারণ এটি শুধু তার জন্যেই বানানো ছিল। এই হল আপাত গল্পটা। প্যারাবল সব সময় আপাত গল্পের ভেতর অন্য একটা গল্প লুকিয়ে রাখে। এই গল্পতেও সেটা আছে। গল্পের প্রধান দুটি চরিত্র হল দারোয়ান ও গ্রাম থেকে আসা একটি লোক। এখানে আইনকেও আমরা একটি চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। এখন এই তিন চরিত্রকে আমরা অ্যালিগরিক্যাল বা রূপক ধরে নিয়ে ভিন্ন কতগুলো সীদ্ধান্তে আসতে পারি। এক ধরনের ব্যাখ্যা আমরা ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসে কে এর সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে করতে পারি। কে-কে একদিন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। কে তার অপরাধ জানে না। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়া পর নিজের অপরাধের সন্ধান চালাতে হয়। তাকে তার জন্য নির্ধারিত আইনের দরজায় যেতে হয়।

সাধারণভাবে আমরা গল্পটিকে একটি রাজনৈতিক-সামাজিক অ্যালিগরি হিসেবে ভাবতে পারি। আমাদের শেখানো হয়, আইনের দরজা সব সময় খোলা, সকলের সমান অধিকার সেখানে। বিচারকের পেছনে এর প্রতীক হিসেবে দেখা যায়, একটি দাঁড়িপাল্লা ধরে আছে চোখ বাধা এক ব্যক্তি। দাঁড়ির পাল্লা দুইদিকে সমান। অর্থাৎ আইন কোনো মানুষ দেখে বিচার করে না। সবাই তার কাছে সমান। কিন্তু বাস্তবজীবনে আমরা ঠিক তার উল্টোটাই ঘটতে দেখি। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা সব সময় আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে মুক্তি পেয়ে যায়, আর নিরাপরাধ অসহায় ব্যক্তিরা দিনের পর দিন আইনের পথে হেঁটে পায়ের জুতা ক্ষয় করে ফেলে। এই গল্পেও সেটা হয়েছে। গ্রামের মানুষটি জানতো আইনের কাছে সবার সব সময় যাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু সে আইনের দ্বারমুখে আটকে যায়। এখানে প্রবেশ করতে হলে শক্তি নিয়ে প্রবেশ করতে হবে। এক একজন দারোয়ান বসে আছে, হয় তাদের খুশি করে নয়ত পরাজিত করে আইনের কাছে যেতে হবে। অর্থাৎ আইনের কাছে পৌঁছানোর পথ হল আইন অমান্য করা! এটাই এই গল্পের আয়রনি।

এর সঙ্গে অস্তিত্ববাদি চেতনাও জড়িত। গল্পটি মুক্ত চেতা বা ফ্রি উইলের ওপর জোর দিয়েছে। একজন ব্যক্তি তার নিজের ভবিষ্যতের জন্যে নিজেই দায়ী। আইনের দরজায় গল্পটি যে জিনিসটির প্রতি ইঙ্গিত দেয় সেটা হল, উদ্দেশ্যহীন জীবন নিরর্থক বা অযৌক্তিক। গল্পে গ্রাম থেকে আসা লোকটির ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়- হয় সে অপেক্ষা করবে নয় সে দরজার ভেতর প্রবেশ করবে। লোকটি অপেক্ষা করার সীদ্ধান্ত নেয়। এ থেকে তার সিদ্ধান্ত না নিতে পারার কারণে জীবনটি অর্থহীনভাবে কেটে যায়। তার মৃত্যুর পর দরজাটি বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রতিটা ব্যক্তির জন্যে একটা মুক্তির পথ থাকে, সেটা তাকে বেছে নিতে হয়। কষ্ট শিকার করে অর্জন করতে হয়। নিজের অদৃষ্টের দিকে তাকিয়ে থেকে অনিবার্যভাবে মুক্তি আসবে না।

নির্বাচিত অনুগল্প

খরগোশ, যারা সকল সমস্যার কারণ ছিল । জেমস থার্বার

সবচেয়ে অল্প বয়সী শিশুটার মনে আছে- নেকড়ে অধ্যুষিত এলাকায় খরগোশদের একটা পরিবার বাস করতো। নেকড়েরা জানিয়ে দিলো যে, খরগোশদের জীবন-যাপনের রীতি-নীতি তাদের পছন্দ না। এক রাতে ভূমিকম্পের কারণে একদল নেকড়ে মারা পড়লো। আর দোষ গিয়ে পড়লো খরগোশদের ঘাড়ে। কেননা সবার জানা যে, খরগোশরা পেছনের পা দিয়ে মাটি আচড়িয়ে ভূমিকম্প ঘটায়। আরেক রাতে বজ্রপাতে নেকড়েদের একজন মারা পড়লো। আবারো দোষ গিয়ে পড়লো ঐ খরগোশদের ওপরে। কারণ সবাই জানে যে, লেটুস পাতা যারা খাই তাদের কারণেই বজ্রপাত হয়। একদিন খরগোশদের সভ্য ও পরিপাটি করার জন্যে নেকড়েরা হুমকি দিলো। ফলে খরগোসরা সিদ্ধান্ত নিলো যে, তারা নিকটবর্তী দ্বীপে পালিয়ে যাবে। কিন্তু অন্যান্য জন্তু-জানোয়াররা যারা খানিক দূরে বসবাস করতো তারা ভর্ৎসনা করে বলল- তোমরা যেখানেই আছ বুকে সাহস বেঁধে সেখানেই থাকো। এ পৃথিবীটা ভিতু-কাপুরুষদের জন্যে নয়। যদি সত্যি সত্যি নেকড়েরা তোমাদের ওপর আক্রমণ করে আমরা এগিয়ে আসবো তোমাদের হয়ে।
কাজেই খরগোশরা নেকড়েদের পাশে বসবাস করতে থাকলো। এরপর এক ভয়াবহ বন্যা হল, সেই বন্যায় আবার নেকড়েদের অনেকেই মারা পড়লো। এবারও যথারীতি দোষ গিয়ে পড়লো ঐ খরগোশ পরিবারের ওপর। কারণ সবাই জানে যে, যারা গাজর কুরে কুরে খায় এবং যাদের বড় বড় কান আছে তাদের কারণেই বন্যা হয়। নেকড়েরা দল বেঁধে খরগোশদের, তাদের ভালোর জন্যেই, ধরে নিয়ে গেল এবং তাদের নিরাপত্তার জন্যেই তাদের একটি অন্ধকার গুহার ভেতরে আটকে রাখলো।
যখন কয়েক সপ্তাহ ধরে খরগোশদের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। সাড়া শব্দ না পেয়ে অন্যান্য জন্তু-জানোয়াররা নেকড়েদের কাছে জানতে চাইলো খরগোশদের ব্যাপারে। নেকড়েরা জানালো যে, খরগোশদের সাবাড় করা হয়ে গেছে। যেহেতু তারা সাবাড় হয়ে গেছে সেহেতু এটা এখন তাদের একান্ত নিজেদের বিষয়। কিন্তু অন্যান্য জন্তুরা হুমকি দিয়ে জানালো, যদি খরগোশদের খাওয়ার উপযুক্ত কোনো কারণ না দেখানো হয় তাহলে তারা সব একত্রিত হয়ে নেকড়েদের বিপক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সুতরাং নেকড়েদের একটি যুৎসই কারণ দশাতেই হল। তারা বলল- খরগোশরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল এবং তোমরা ভালো করেই জানো যে পলাতক-কাপুরুষদের জন্যে এ দুনিয়া না!

আইনের দরজায় । ফ্রানৎস কাফকা

আইনের দোরগোড়ায় অপেক্ষমান এক দারোয়ান। এই দারোয়ানের কাছে গ্রাম থেকে আগত এক লোক এসে প্রবেশ অনুমতির প্রার্থনা করে। কিন্তু দারোয়ান বলে যে, সে তাকে ঠিক এই মুহূর্তে ভেতরে ঢুকার অনুমতি দিতে পারছে না। লোকটা ক্ষণিক ভেবে জিজ্ঞাসা করে, খানিক পরে ঢুকতে দেওয়া যায় কিনা। ‘তা সম্ভব’, দারোয়ান বলে, ‘তবে এই মুহূর্তে নয়’। যেহেতু আইনের দরজাটা খোলায় আছে এবং দারোয়ান এক পাশে সরে আছে, উৎসুক লোকটি উঁকি দিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা চালায়। এটা দেখে হেসে উঠে দারোয়ান বলে- ‘যদি তোমার এতই ইচ্ছে হয়, আমার বাধা না মেনে ভেতরে চলে যেতে পারো। তবে মনে রেখ, আমি ক্ষমতাবান। এবং আমি হচ্ছি সবচেয়ে নিচুপদের দারোয়ান। ভেতরে হল থেকে হলে একজন করে দারোয়ান আছে। প্রত্যেকে তার আগের জনের থেকে শক্তিধর। তৃতীয় দারোয়ানের চোখেই আমি চোখ রাখতে পারি না।’ গ্রাম থেকে আসা লোকটি এতসব জটিলতার কথা ভেবে এখানে আসেনি। সে ভেবেছে, নিশ্চয় আইনে সবার সব সময় সমান প্রবেশাধিকার আছে। কিন্তু এখন সে যখন দারোয়ানকে আরও কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করল- ফারের কোট পরা, লম্বা সরু নাক, লম্বা-পাতলা-কালো তাতারদের দাড়ি, সে সিদ্ধান্ত নিল- সে বরং অপেক্ষা করবে। দারোয়ান তাকে একটা মুড়া দিয়ে দরজার একপাশে বসার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। সে ওখানে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বসে কাটিয়ে দেয়। মাঝে সে বেশ কয়েকবার ভেতরে প্রবেশের জন্যে আর্জি করেছে। প্রতিবারই দারোয়ান কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করেছে, জানতে চেয়েছে তার বাড়ি-ঘর সম্পর্কে, আরও অন্যান্য সব বিষয় নিয়ে। এগুলো খালি পদস্ত লোকদের একটু ভাব ধরে কিছু কথা বলার মতোই। এবং প্রতিবারই শেষ করেছে এই বলে যে, এখনও তাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়ার সময় আসেনি। লোকটি তার ভ্রমণের জন্য যতকিছু সঙ্গে এনেছিল, দামি অদামি সব, আস্তে আস্তে ঘুষস্বরূপ দারোয়ানকে দিয়ে দিল। দারোয়ান প্রতিবারই এটা গ্রহণ করে বলেছে- ‘আমি শুধু এটা গ্রহণ করছি, যাতে তুমি নিজেকে নিজে বলতে পারো সব চেষ্টা তুমি করেছিলে।’ এই অনেকগুলো বছরে দারোয়ানের দিকে লোকটির মনোযোগ প্রায় আটকে গিয়েছিল। সে অন্যান্য দারোয়ানদের কথা ভুলেই গিয়েছিল। এই প্রথম দারোয়ানকেই তার কাছে আইনের পথে মূল বাধা বলে মনে হচ্ছিল। শুরুর বছরগুলোকে সে তার মন্দ ভাগ্যকে গাল-মন্দ করছিল- ভীষণ রেগে আর উচ্চবাচ্যে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে খালি নিজেকে তার অসন্তুষ্টি বিড়বিড় করে জানান দিচ্ছিল। বাচ্চা বনে যায় সে। দারোয়ানকে এতটা কাল ধরে দেখতে দেখতে তার কোর্টে বসা মাছিগুলোও পরিচিত হয়ে ওঠে। মাছিগুলোর কাছেও সে বিনতি করে দারোয়ানের মন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার জন্যে। শেষমেশ তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। সে বুঝে উঠতে পারে না, তার আসে পাশে ঐগুলো অন্ধকার নাকি চোখের ধোকা। তবে ঐ অন্ধকারের ভেতর থেকেই সে উপলব্ধি করতে পারে, আইনের দরজা থেকে একটা অনির্বান দীপ্তি ভেসে আসছে। আর বেশি দিন বাঁচবে না সে। মৃত্যুর আগে, এতদিন ধরে সংগৃতি সকল অভিজ্ঞতা তার মাথায় জড় হয়ে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়- একটা প্রশ্নে যেটা সে এখনও দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করেনি। সে হাত নাড়িয়ে দারোয়ানের দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করে, যেহেতু উঠে দারোয়ানের কাছে যাওয়ার মতো শক্তি আর অবশিষ্ট নেই তার দেহে। দারোয়ানকে এগিয়ে আসতে হল। তাকে ঝুকে আসতে হয় কেননা দুজনের শরীরের উচ্চতার ফারাকে অসুবিধা হচ্ছিল। ‘এখন আবার তুমি কি জানতে চাও? দারোয়ান জানতে চাইল। তোমার তৃপ্তি কোনোদিনই মেটানো সম্ভব না। প্রত্যেকেই তো আইনের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করে’। লোকটি বলল, ‘এটা কি করে সম্ভব হল যে এতকাল ধরে আমি ছাড়া আর কেউ আইনের কাছে যাওয়ার জন্যে এলো না?’ দারোয়ান বুঝতে পারলো যে, লোকটি তার জীবনের চরম সীমায় চলে এসেছে। সে আর ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছিল না, দারোয়ান কানের কাছে চেঁচিয়ে বলল, ‘যেহেতু এই দরজা শুধু তোমার জন্যে তৈরি করা হয়েছিল, সেহেতু আর কেউ ভেতরে ঢুকতে পারত না। আমি এখন এটা চিরকালের মতো আটকে দিতে যাচ্ছি।’

নিমগাছ । বনফুল

কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে। পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ। কেউ বা ভাজছে গরম তেলে। খোস দাদ হাজা চুলকুনিতে লাগাবে। চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ। কচি পাতাগুলো খায়ও অনেকে। এমনি কাঁচাই….. কিংবা ভেজে বেগুন- সহযোগে। যকৃতের পক্ষে ভারী উপকার। কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক…। দাঁত ভালো থাকে। কবিরাজরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুশি হন। বলেন- নিমের হাওয়া ভাল, থাক, কেটো না। কাটে না, কিন্তু যত্নও করে না। আবর্জনা জমে এসে চারিদিকে। শান দিয়ে বাধিয়েও দেয় কেউ- সে আর এক আবর্জনা। হঠাৎ একদিন একটা নূতন ধরনের লোক এলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিমগাছের দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাঙ্গলে না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু। বলে উঠলো, বাঃ কি সুন্দর পাতাগুলো…..কি রূপ। থোকা থোকা ফুলেরই বা কি বাহার….এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাঃ! খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেল। কবিরাজ নয়, কবি। নিমগাছটার ইচ্ছে করতে লাগল লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভেতর শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল সে। ওদের বাড়ীর গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এই দশা।

বার্লিন । ম্যারি বয়লি ও’রেইলি

একটি ট্রেন হামাগুড়ি দিয়ে বার্লিন ছেড়ে আসছিল। ট্রেনের প্রতিটা বগি নারী ও শিশুতে গিজগিজ করছিল। সুস্থ-সবল দেহের পুরুষ মানুষ সেখানে ছিলো না বললেই চলে। একজন বয়স্ক মহিলা ও চুলে পাক ধরা সোলজার পাশাপাশি বসে ছিলেন। মহিলাটিকে বেশ রুগ্ন ও অসুস্থ দেখাচ্ছিল। তিনি গুনে চলেছেন- ‘এক, দুই, তিন’, ট্রেনের মতোই আপন ধ্যানে স্বল্প বিরতি দিয়ে। ট্রেনের একটানা ঝিক্ঝাক্ শব্দের ভেতরেও যাত্রীরা তার গণনা দিব্যি শুনতে পাচ্ছিল। দুটি মেয়ে বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করছিল। বলাই বাহুল্য, তারা মহিলার গণনা শুনে বেশ মজা পাচ্ছিল। মেয়ে দুটোকে উদ্দেশ্য করে একজন মুরব্বী গোছের লোক বিরক্তিসূচক গলা খ্যাঁকানি দিয়ে উঠলে কক্ষটিতে এক ধরনের হালকা নীরবতা এসে ভর করলো।
‘এক, দুই, তিন’- মহিলাটি শব্দ করে গুণলেন, যেন পৃথিবীতে সেই একমাত্র বাসিন্দা। মেয়ে দুটি আবারও খুকখুক করে হেসে উঠলো। বোঝা গেল তারা হাসিটা চেপে রাখার যথেষ্ট চেষ্টা করা সত্ত্বেও ব্যর্থ হয়েছে। পাশে বসা বয়স্ক সোলজার সামনের দিকে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে ভারী গলায় বললেন- ‘শোনো মেয়েরা, আশা করি আমার কথাগুলো শোনার পর তোমরা আর হাসবে না। এই অসহায় মহিলাটি আমার স্ত্রী। কিছুক্ষণ আগেই আমরা যুদ্ধে আমাদের তিন সন্তানকে হারিয়েছি। যুদ্ধের সম্মুখভাগে অগ্রসরের আগে আমি তাদের মাকে একটা বিকারগ্রস্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে রাখতে যাচ্ছি।’
কক্ষটিতে ভয়ঙ্কর নীরবতা এসে ভর করলো।

কিভাবে সে প্রায়শই ঠিক ছিল । লিডিয়া ডেভিস

প্রায়ই আমি ভাবি যে আমরা কি করবো না করবো এ ব্যাপারে তার ধারণাটা ভুল এবং আমারটাই ঠিক। যদিও আমি জানি, আগে তার অনেক সিদ্ধান্তই ঠিক ছিল। এবং ভুল আগে আমিও খানিকটা করেছি। কাজেই আমি তাকে ঐ ভুল সিদ্ধান্তটা নিতে দিই; নিজেকে বোঝায়, যদিও আমি তখনো মনে করি না যে তার ভুল সিদ্ধান্ত কখনো সঠিক হতে পারে। পরে দেখা গেলো, আগেও এমন হয়েছে, তার সিদ্ধান্তই ঠিক ছিল। মোটের ওপর তারপরও তার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। কিন্তু তা ভুল ছিল প্রকৃত অবস্থাভিন্ন অন্য কোনো পরিস্থিতির জন্যে। সেই একই সিদ্ধান্ত আবার সঠিক ছিল এমন সব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে যেগুলো আমি কখনই পরিস্কারভাবে বুঝে উঠতে পারিনি।

কথা । স্বপ্নময় চক্রবর্তী

আমি বনগাঁ লাইনের গোবরডাঙা শ্যামসুন্দর বিদ্যামন্দিরের মাস্টার। চারটে ছ’য়ের ডাউন বনগাঁ লোকালে উঠে বাড়ি ফিরি। একটা নির্দিষ্ট কামরা আছে আমাদের। মছলন্দপুর থেকে দুজন মাস্টারমশাই ওঠেন। ওই দুজনের জন্য জায়গা রাখি।
যে কামরায় উঠি, সেই কামরার জানালার ধারে মুখোমুখি সিটে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা বসেন। ভদ্রলোক বই পড়েন, ভদ্রমহিলাও বই পড়েন। ভদ্রলোকটি কী বই পড়েন আড়চোখে দেখেছি। রামকৃষ্ণ কথামৃত, ভারতের সাধক, চৈতন্যচরিতামৃত এইসব। ভদ্রলোকটির বয়েস ষাটের মতো, ভদ্রমহিলারও প্রায় ওরকম। ভদ্রলোকের মাথায় টাক, ভদ্রমহিলার মুখে শ্বেতির চিহ্ন। ওরা দুজনে একই কামরায়, একই ট্রেনে বহুদিন। ভদ্রমহিলাও পড়েন। নব কল্লোল, বুদ্ধদেব গুহ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা। কোনোদিনই কথা বলতে দেখিনি ওদের। ভদ্রমহিলা হৃদয়পুর স্টেশনে নেমে যান। স্টেশনে ট্রেনটা ঢুকবার একটু আগে ভদ্রমহিলা সিট ছেড়ে উঠে রোজই বলেন- এসে গেলাম, আসি। আবার কাল কথা হবে কেমন?
ভদ্রলোক বই থেকে চোখ তুলে বলেন- হ্যাঁ, আবার কাল কথা হবে।

ক্ষুধা‬ । ভাস্কর চৌধুরী

তিনটে লোক কোদাল আর শাবল হাতে রাতে বাড়ি ফিরছে। তারা কৃষক। সহজ সরল মানুষ। বাড়িতে মাঝরাতে ভাত পাবে এমন আশা নেই অথচ পেটে ক্ষিধে। তারা একে অন্যকে বললো- কি করি রে ? খিদা যে। আরেকজন বললো- ঘরে ভাত নাই। বলতে বলতে এক মহাজনের বাড়িতে এলো। শীতের রাত। নিশ্চয় কেউ জেগে নেই। সীমানা দেয়ালটা নরম ইটের। একজন বললো- চল সিঁদ কাটি। তারা সিঁট কাটতে বসলো। ধীরে গুতো দিতেই দু-চারটে ইট সরে গেলো। তখন তাদের একজন ইট ধরে রাখে আরেকজন কাটে। প্রায় অল্পতেই ফাঁক পাওয়া গেলো। রান্নাঘরটা উঠোনে মাঝখানে। খড়ের ছাউনি। ভেজানো কপাট। বিড়ি খাওয়া ম্যাচ জ্বালিয়ে তারা ভাতের হাঁড়ি পেলো। ডালিতে পেঁয়াজ মরিচ। মুচিতে লবণ তারা একটা করে থালা নিয়ে নিঃশব্দে পান্তা ভাত পেঁয়াজ দিয়ে নিঃশব্দে খেলো। পেট টুবটুব করছে। তারা যেমন এসেছিলো, রান্না ঘরে শেকল তুলে দেয়ালে ফুটো দিয়ে বেরিয়ে গেলো। একজন বললো- আহা, বড় খিদা ছিলো রে। আরেকজন বললো- চুরি করিনি। চাইলেই দিতো। এতো রাইতে কে ডাকে ? তৃতীয়জন বমি করতে করতে বললো, কামটা ঠিক হইছে কি?

মুখোমুখি ছায়া-কায়া । মোজাফফর হোসেন

ছায়াকথন

স্টেশনে বসে আছি ঠায়। ট্রেন আসে, আবার চলেও যায়। বুক পকেটের টিকিট শরীরের ভাপে ভিজে জবুথবু। কেউ আসবার কথা নয়। আমি ফিরে যাবো কারো কাছে, এই শহরে এমন কেউ নেই আর। কাউকে পাঠাবো না ভেবে যে চিঠিখানা লিখেছিলাম, দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছি পরিত্যক্ত এক পুকুরে। আর বালিকা বারবনিতার মধ্যগগণে চুমু খেয়ে উঠে এসেছি এই ভরদুপুরে, চুপিসারে। এর বেশি কিছুই রেখে যাচ্ছি না এই শহরে।

আরও একবার ভালো করে দেখে নিতে চেষ্টা করি শরীরের প্রতিটা ভাঁজে—হাত গলিয়ে পড়ে শূন্যে। এদিক ওদিক ভালো করে দেখি—আমি কারো ছায়া, একাকী অপেক্ষমাণ। আমার অস্পষ্ট অস্তিত্ব চোখে পড়ছে না কারো। স্টেশনের প্রতিটা দেহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলাম নিজেকে। বুঝলাম আমাকে রেখেই ফিরে গেছে সে, অন্য কোনও ছায়ার সন্ধানে।

বিমূর্ত আমি মূর্ত হওয়ার সন্ধানে খুঁজে ফিরি শরীর। সাড়ে পাঁচ ফিট, ছিপছিপে গড়ন—একটু এদিক-ওদিক হলেও ক্ষতি নেই, কে কার ছায়া মেপে দেখে! শরীর বড় দরকার, শরীর ছাড়া ইচ্ছেশক্তি বড্ড অকেজো এখানে।

কায়াকথন

ট্রেন থেকে নেমেই হাঁটা দিই রাজপথের আইল ধরে। সূর্য তখন ডুবুডুবু। ফাঁকা রাস্তায় পিছন ফিরে দেখি, ছায়াটি নেই সঙ্গে। কী সর্বনাশ! দ্রুত ছুটে যাই স্টেশনে। তন্ন তন্ন করে খুঁজি তাকে শত শত মানুষের ভিড়ে। কোনও ছায়াই ঠিক মেলে না—না আকারে, না প্রকারে!
ফিরতি ট্রেনে ফিরে গেলাম ফেলে আসা শহরে। রাস্তায় অলিতে-গলিতে ছায়ার সন্ধানে। চলতি পথে প্রতিটি ছায়ার সাথে মিলিয়ে দেখলাম নিজেকে। এখন বুঝতে পারছি, ওকে চিনে রাখবার খুব দরকার ছিল।

শেষ পর্যন্ত না পেয়ে জনসমুদ্রের মাঝখান থেকে অন্য একজনের ছায়া নিয়ে সটকে এসেছি নীরবে। এখন আমি ওকে চোখে চোখে রাখি। সূর্যের নীচে কিংবা আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে পরখ করি ঘনঘন। মাঝে মধ্যে কথাও বলি ওর সঙ্গে। অন্যের ছায়াকে নিজের করার চেষ্টায়
এখন কেটে যাচ্ছে দিনকাল।

ছায়া -কায়া দ্বন্দ্ব

লোকটি (যার ছায়া ছায়া-হারানো লোকটি ছিনতাই করেছিল) এতদিনে নিশ্চয় সে ছিনতাই করেছে অন্য কারো ছায়া। তারপর সেই লোকটি আর একজনের। অতঃপর ঐ লোকটি অন্য কারো; কিংবা আপনার…! এইভাবে শুরু হয়েছে ছায়া ছিনতাইয়ের কাহিনি। আজকাল আলোর নিচে ছায়াসমেত কায়া দেখলেই মনে হয়—আপনার ছায়াটি আসলেই আপনার তো?

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





মন্তব্য করুন

আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন করুন: