অনুবাদসাক্ষাৎকার  | অন্যান্য

সাক্ষাৎকার : মার্গারেট অ্যাট্উড | ভূমিকা ও অনুবাদ : মোজাফ্ফর হোসেন

‘পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করি না। আমার বিশ্বাস নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে।’


[দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল ও মার্গারেট অ্যাট্উড: বিশ শতকের অন্যতম প্রধান নারীবাদী উপন্যাস ‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’-এর রচয়িতা কানাডার কবি, কথাসাহিত্যিক, সাহিত্যসমালোচক ও মানবাধিকারকর্মী মার্গারেট অ্যাট্উড (জ.১৯৩৯)। অ্যাট্উড বর্তমান বিশ্বের জীবিত লেখকদের মধ্যে প্রথম সারির লেখক হিসেবে গণ্য। গত কয়েকবছর থেকেই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য উচ্চারিত হয়ে আসছে তাঁর নাম। বুকার পুরস্কারসহ ইউরোপের নামিদামি সব পুরস্কার ও সম্মাননা তিনি অর্জন করেছেন।


অ্যাট্উডের দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল উপন্যাসটির প্রকাশকাল ১৯৮৫। এটি হাক্সলির ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড, অরওয়েলের ১৯৮৪, সুইফটের গ্যালিভার্স ট্রাভেলস-এর মতো ডিসটোপিয়ান উপন্যাস। ডিসটোপিয়ান হলো ইউটোপিয়ান বা আদর্শ সমাজব্যবস্থার ঠিক উল্টো অবস্থা। সেই অর্থে উপন্যাসটিকে পলিটিক্যাল স্যাটায়ার বা এলিগরিক্যাল উপন্যাসও বলা চলে। উপন্যাসটি আবার আরেক অর্থে কল্পকাহিনিও বটে। কেননা যে সমাজব্যবস্থার কথা এখানে বলা হচ্ছে, সেটি অদূর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য এক সমাজব্যবস্থা। কাল্পনিক রাষ্ট্রটির নাম ‘রিপাবলিক অব গিলেড’। একসময় রাষ্ট্রটি যুক্তরাষ্ট্র নামে পরিচিত ছিল। এখন সেটি কনজারভেটিব রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের হাতে জিম্মি সাধারণ জনগণ। আরও নির্দিষ্ট করে বললে নারী ও শিশু।


উপন্যাসে কল্পিত-রাজ্য রিপাবলিক অব গিলেডে যুদ্ধ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। দূষণে সেখানকার অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সাধারণ নারীদের ধরে ধরে সেনাপুরুষদের রক্ষিতা বানানো হয়। যারা সন্তানদানে সক্ষম তাদের রাখা হয় গৃহেÑহ্যান্ডমেইড করে, আর যারা সন্তানদানে অক্ষম তাদের রাখা হয় রাষ্ট্রের সম্পত্তি বানিয়ে পতিতাপল্লীতে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কেট তার স্বামী ও কন্যাশিশুকে নিয়ে প্রতিবেশী দেশ কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। ঘটনাস্থানেই স্বামীকে মেরে ফেলা হয়, অপহরণ করা হয় মেয়েকে। কেটকে তুলে এনে আর পাঁচটা সাধারণ নারীর মতো পরীক্ষা করা হয় সে সন্তান ধারণে সক্ষম কিনা। পরীক্ষার ফলাফল ইতিবাচক হলে তাকে ‘হ্যান্ডমেইড’ বা রক্ষিতা হিসেবে পাঠানো হয় কমান্ডো ফ্রেড ও তার স্ত্রী সেরেনা জয়ের বাড়িতে। সেখানে তার নতুন নাম পড়ানো হয় ‘অফফ্রেড’ (অফফ্রেড মানে ফ্রেডের সম্পত্তি) কেটকে সেরেনা জয়ের হাঁটুর মাঝে রেখে ধর্ষণ করে কমান্ডার—বাইবেলের উক্তি টেনে এ সময় বলা হয়, এভাবে কেট গর্ভবতী হলে সেই সন্তান হবে সেরেনার। রীতি অনুযায়ী সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাকে কেটের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। কেটকে পরবর্তী সন্তান-উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হবে অথবা তাকে অন্য কোনো কমান্ডারের কাছে হস্তান্তরিত করা হবে।


প্রতিদিন নিয়ম করে ধর্ষণ করা হয় কেটকে, চেক-আপের জন্য পাঠানো হয় ডাক্তারের কাছে। সেখানে তার সঙ্গে অন্যান্য হ্যান্ডমেইড নারীদের সাক্ষাৎ ঘটে। কর্তব্যরত ডাক্তার জানায়, নারীদের মতো অধিকাংশ পুরুষই বন্ধ্যা হয়ে গেছে। কমান্ডার ফ্রেড নিজেও একজন বন্ধ্যা পুরুষ। কিন্তু গিলার্ডের মানুষ বিশ্বাস করে পুরুষ কখনো বন্ধ্যা হয় না। বিধায় সব দোষ গিয়ে পড়ে নারীদের ওপরেই। ডাক্তার জানায়, এখন সন্তান না হওয়ার কারণে আগের রক্ষিতাদের মতো কেটকে মেরে ফেলা হবে অথবা যৌনপল্লীতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ডাক্তার তার সঙ্গে গোপনে মিলিত হওয়ার জন্য কেটকে প্রস্তাব দেয়। কেট রাজি হয় না।


কেট বিশ্বাস করে তার মেয়েকে সে একদিন ফিরে পাবে। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক গড়ে তুলে সে অন্তঃসত্ত্বা হবে। সে জানে, অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তবু সে মেয়ের জন্য জীবনঝুঁকি নিতে রাজি হয়। এরইমাঝে কমান্ডারের ড্রাইভার নিকের সঙ্গে কেটের পরিচয় ঘটে। তাদের ভেতর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নিকের মাধ্যমে অন্তঃসত্ত্বা হয় কেট।


‘দ্য হ্যান্ডসমেড’স টেল’ উপন্যাসে অবস্থানগতভাবে নারীদের কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। আন্টস বলে ডাকা হয় যাদের, তাদের কাজ হলো নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা। এদের পোশাক বাদামি রঙের। মার্থাস বলে যাদের ডাকা হয় তাদের কাজ হলো গৃহকর্মের কাজ পরিচালনা করা। এদের পোশাক ধূসর নীল রঙের। হ্যান্ডমেইডস বলে যাদের ডাকা হয় তাদের কাজ হলো শুধুমাত্র বংশবিস্তার করা। এদের পোশাক লাল রঙের। এদের আশপাশে আত্মহত্যা করা যায় এমন কোনো মাধ্যম রাখা হয় না। আর ওয়াইভস নামের নারীরা এই সকল নারীর উপরে কর্তৃত্ব স্থাপন করে। তারা মোটামুটি সুবিধাভোগী শ্রেণি। তাদের পোশাক নীল রঙের। এভাবেই নারীদের ব্যক্তিক পরিচয়ে পরিচিত না করে দলগত পরিচয়ে পরিচিত করে তোলা হয়।


পাপ বলে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা, পর্নো ম্যাগাজিন পুড়িয়ে ফেলা ও যৌনপল্লী গুড়িয়ে ফেলা হলেও গোপনে এসবের সবই বহালতবিয়বে চালু থাকে, তবে শুধুমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য। সাধারণদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে এ জগৎ। রক্ষিতাদের কানে সবসময় তুলে দেওয়া হয়, ‘তারা ঈশ্বর-সেবা করছে’। কেউ এসব নিয়মের প্রতিবাদ করলে ‘টেচারি’বা ‘যৌনপাপ’ বলে তাকে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।


লেখক মার্গারেট অ্যাট্উড কাল্পনিক এই রাজ্যের গল্প ফেঁদে উপহাস করেছেন শ্রেণিভিত্তিক শাসন-ব্যবস্থার। অ্যাট্উড উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেন আশির দশকে, এর কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনে জয়যুক্ত হন রোনাল্ড রিগ্যান ও ব্রিটেনে মার্গারেট থ্যাচার। এভাবে পশ্চিমে সংস্কারবিরোধীরা ক্ষমতায় আসাতে ষাট ও সত্তর দশকব্যাপী উজ্জীবিত হয়ে ওঠা নারীবাদী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসার সম্ভাবনা দেখা দেয়। ‘রিলিজিয়াস রাইট’মাথা চাড়া দেওয়ায় ‘সেক্স্যুয়াল রেভ্যুলুশন’ নিয়ে শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তৎকালীন নারীবাদীরা। তাদের মধ্যে মার্গারেট অ্যাট্উডও ছিলেন। আলোচ্য উপন্যাসে তিনি ইউরোপবাসীকে আগাম সতর্ক করে দিলেন। গিলেডের নারীরা শুধু ভোটাধিকারই না, লিখতে ও পড়তে পারার অধিকারও হারালো। সেই সঙ্গে আশির দশকে নিউক্লিয়ার শক্তির ফলে পরিবেশ নষ্ট ও মানুষের জন্মদানের ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব সহকারে এই উপন্যাসে উঠিয়ে আনলেন। ফলে উপন্যাসটি একদিকে যেমন নারীবাদী ও মানবতাবাদী অন্যদিকে তেমন পরিবেশবাদীও।


উল্লেখ্য, দ্য হ্যান্ডমেইড টেল থেকে একই নামে ১৯৯০ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। পরিচালনা করেন বিখ্যাত পরিচালক ভলকার স্কলনডোর্ফ এবং চিত্রনাট্য লেখেন নোবেলজয়ী নাট্যকার হারল্ড পিন্টার। এছাড়াও উপন্যাসটি অবলম্বনে নির্মিত অপেরাও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে।


অ্যাট্উডের বর্তমান সাক্ষাৎকারটি প্যারিস রিভ্যুতে প্রকাশিত। গ্রহণ করেছেন আমেরিকান কথাসাহিত্যিক ম্যারি মরিস। প্রকাশকাল ১৯৯০।]


সাক্ষাৎকার

অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিষয়টি সবসময় আপনার লেখার অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে এসেছে। কারণ কি?

অ্যাট্উড : আমি কানাডার উত্তর-বনাঞ্চলের ভেতর বেড়ে উঠেছি। সেখানে টিকে থাকতে হলে কিছু বিষয়ে জ্ঞান রাখা প্রয়োজন। আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম, তখন জনহীন প্রান্তরে কিংবা জঙ্গলের ভেতরে টিকে থাকার জন্যে যে ধরনের প্রশিক্ষণব্যবস্থা এখন চালু হয়েছে, তখন তা ছিল না। তবে আমাকে অল্পবিস্তর শেখানো হয়েছে, আমি যদি জঙ্গলে পথঘাট হারিয়ে ফেলি, সেটি কিভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে সেসব বিষয়-আশয়। কাজেই অস্তিত্বের সংগ্রামটি শুরু থেকেই আমার জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।

অস্তিত্বরক্ষার বিষয়টি শারীরিক কৌশল থেকে কখন বুদ্ধিবৃত্তিক বা রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ হয়ে দাঁড়ালো?

অ্যাট্উড : যখন আমি কানাডাকে একটি দেশ হিসেবে ভাবতে শুরু করলাম, তখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম শুধু ব্যক্তিক না, জাতীয় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ষাটের দশকে যখন আমি যুক্তরাষ্ট্রে আসলাম, দেখলাম, কেউ ভালোভাবে জানে না কানাডা কোথায় অবস্থিত। কারো ভাই হয়ত সেখানে মাছ ধরতে বা অন্য কোনো কাজে গেছে। আমি যখন হার্ভাডে ছিলাম, আমাকে এক নারী ‘বহিরাগত ছাত্র’ হিসেবে তার বাসায় দাওয়াত করেছিল। আমাকে বলা হয়েছিল, আমার স্থানীয় সাঁজে যেতে, দুঃখের বিষয় আমার সেই পোশাকগুলো বাড়িতে রেখে এসেছিলাম।

‘বহিরাগত’ বিষয়টি আপনার লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে।

অ্যাট্উড : এই অনুভূতিটা সবখানেই ছিল। একমাত্র দেশের কেন্দ্রস্থলের একেবারে কেন্দ্রে, যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্রে তুমি এই বিষয়টা এড়িয়ে চলতে পারো। একটা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে তুমি তোমার অভিজ্ঞতাকে বৈশি^ক অবস্থান থেকে ভাবতে পারো। সাম্রাজ্যের বাইরে বা প্রান্তসীমায় সেটি তুমি ভাবতে পারবে না।

আপনি ‘দ্য জার্নাল অব সুজানা মূডি’-এর উত্তরকথনে লিখেছিলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক অসুস্থতা ‘অতিআত্মম্মন্যতা’ হয়, তবে কানাডার ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে ‘ভগ্নমনস্কতা’। এ সম্পর্কে একটু বিশদ বলবেন কি?

অ্যাট্উড : যুক্তরাষ্ট বড় এবং ক্ষমতাধর। কানাডা বিভক্ত এবং হুমকির মুখে পতিত। আমার হয়ত ‘অসুস্থতা’ বলা ঠিক হয়নি। হয়ত বলতে হতো ‘মানসিক অবস্থান’। পুরুষ লোকেরা প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনার নারী চরিত্ররা এমন বিভ্রান্ত কেন? এটা আসলে মানসিক বৈকল্যের মতো কোনো বিষয় না। তাদের অবস্থানটা তুলে ধরা মাত্র। আমেরিকা ভাবছে যে তারা অতিকায় এবং ক্ষমতাধর, এটি তাদের জন্যে কোনো বিভ্রম না। তারা আরো শক্তিশালী হতে চায়। প্রত্যেক কানাডিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা দুর্বোধ্য সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে আমেরিকানরা চিন্তা করে কানাডা হলো এমন এক দেশ যার ওপর দিয়ে তাদের জলবায়ু আসে। দুর্বোধ্যতার বিষয়টি হল, তুমি একটি অসম ক্ষমতা বন্ধনে নিজেকে কোন অবস্থানে ভাবতে পারো, সেখানে।

এই রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে আপনি কানাডা এবং কানাডার সাহিত্যকে কিভাবে দেখেন?

অ্যাট্উড : কানাডা কারো অধীনস্থ বা দখলকৃত দেশ না। এটা হলো শাসিত রাষ্ট্র। একটি পরাধীন দেশে সবকিছু অনেক বেশি স্পষ্ট থাকে—কে ভিলেন আর কে নায়ক সেটা বুঝতে সমস্যা হয় না। অন্যতম দুর্বোধ্য এক বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে যা পাবে তাই সাবাড় করে নেবে। সেই হিসেবে তারা বেশ উদার। কানাডার লেখকরা প্রায়ই দেখেন যে, তারা কানাডার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই ভালো ছিলেন। কারণ কানাডায় বাস করা অনেকটা ছোট একটা শহরে বাস করার মতো।

লেখক হিসেবে আপনি কোথায় বেশি সম্মানিত হয়েছেন?

অ্যাট্উড : আমি কানাডায় অনেকবেশি বিদ্বেষপূর্ণ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছি, কারণ এটা আমার নিজের দেশ। আমরা জানি, পরিবারগুলোর ভেতরেই সবচেয়ে বাজে কোলাহলটা হয়। অবশ্যই কানাডায় মানুষ আমাকে পথে ঘাটে চেনে, আমার বই বিক্রি হয়। কানাডায় মাথাপিছু হারে আমার যে বই বিক্রি হয়, সেই হারে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হলে আমি ধনাঢ্য বনে যেতাম।

নারীদের বই প্রকাশের ঝামেলা কি পুরুষদের থেকে বেশি?

অ্যাট্উড : এই প্রশ্নের ব্যাপ্তিটা অনেক। যেমন, তুমি কি উত্তর আমেরিকা, আয়ারল্যান্ড বা আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটা করছ? নারী-পুরুষ এই লিঙ্গভেদ ছাড়াও আরো অনেক প্রসঙ্গ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যেমনÑ বয়স, শ্রেণি, বর্ণ, অঞ্চল, জাতীয়তা, পূর্বোক্ত প্রকাশনা, যৌনপ্রবণতা। আমার মনে হয়, প্রশ্নটা আমরা সাঁজিয়ে এভাবে করতে পারি—কোনো নারী লেখকের জন্যে তার সমগোত্রীয় অপর একজন পুরুষ লেখকের প্রথম উপন্যাস প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য থাকে কিনা না? উত্তর হলো—থাকে। পৃথিবীর অনেক দেশেই নারীরা প্রকাশক খুঁজে পান না, যেমন মধ্যপ্রাচ্যের নারী লেখকদের কথা ধরো, কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার কালো নারী লেখকদের কথা ধরো। আমি তো বলবো, তাদের জন্যে লিখে যাওয়াটাই অনেকবেশি চ্যালেঞ্জের।

তবে যদি উত্তর আমেরিকার প্রকাশকদের কথা বলি, এখানে যা দিয়ে তারা ব্যবসা করতে পারবে, তাই তারা প্রকাশ করবেন। সেটা নারী-পুরুষ বা কচ্ছপের লেখা হলেও চলবে। এখানে নারী পুরুষ বলে আলাদা করে কোনো পলিসি থাকে বলে আমি মনে করি না। তবে হ্যাঁ, এখনো যে পরিমাণ বই বের হয়, তার অধিক সংখ্যক পুরুষদেরই লেখা, আলোচকরাও পুরুষ। আলোচকদের বিষয়ে কথা হতে পারে। এখানে এসেই ঝামেলাটা তৈরি হয়।

একজন নারী লেখকের জন্য পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা কতটা কঠিন?

অ্যাট্উড : আমার বইয়ের বেশির ভাগ বর্ণনাভঙ্গি বা দৃষ্টিভঙ্গি নারীর। তবে আমি কখনো কখনো এমন চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও লিখেছি যে পুরুষ। লক্ষ করো, আমি সরাসরি ‘পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি’ বললাম না। আমি নিজে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করি না। আমার বিশ্বাস নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমি তখনই কেবল পুরুষ বর্ণনাকারীর আশ্রয় নিই, যখন সেটির খুব দরকার পড়ে।

কেবল মাত্র বই পড়েই আপনি কি বলে দিতে পারবেন, সেটি নারী না পুরুষ লেখকের লেখা?

অ্যাট্উড : কখনো কখনো অবশ্যই, তবে সবসময় না। একসময় তো মনেই করা হতো, নারীরা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখতে পারেন না, লেখা উচিতও না। পুরুষরা নারীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজেকে উপস্থাপন করতে চায় না। অথচ এটা প্রমাণসিদ্ধ যে, কথাসাহিত্যে বা মঞ্চের বেশিরভাগ বদমেজাজী, বাজে স্বভাবের পুরুষ চরিত্রগুলো পুরুষ লেখকদেরই সৃষ্টি। একজন পুরুষের পা দিয়ে গন্ধ বের হচ্ছে, সে টেবিলে বসে খেতে জানে না, তার কোনো মূল্যবোধ নেই, এটা যদি কোনো পুরুষ লেখক লেখেন তো ঠিক আছে; কিন্তু যদি কোনো নারী লেখক একই কথা লেখেন, তাহলে বলা হবে যে সেই নারী লেখক পুরুষবিদ্বেষী। পুরুষের আত্মমর্যাদায় তখন বাধে। আবার নারী লেখক যদি আদর্শ কোনো পুরুষ চরিত্রের কথা তুলে ধরেন, অন্য পুরুষরা তাকে ‘দুর্বল’ বলে চিহ্নিত করবেন;—যদিও একজন পুরুষ লেখক যখন একজন পুরুষ চরিত্রকে দিয়ে রান্নাঘরের কাজ করিয়ে নেন, তখন সেটি হয়ে ওঠে ‘বাস্তবসম্মত’ বিষয়।

কবিতা এবং কথাসাহিত্য লেখার বিষয়টা আপনার কাছে কিভাবে আলাদা হয়ে ধরা দেয়?

অ্যাট্উড : আমার তত্ত্ব হলো, কবিতা এবং কথাসাহিত্য মোটামুটি লাগালাগি থেকে মস্তিষ্কে আলাদাভাবে অবস্থান করে। যখন আমি একটি উপন্যাস লিখি, আমি মনে করি তখন আমি অনেক বেশি সুসংগঠিত, হিসেবি থাকি। উপন্যাস লিখতে গেলে সেটি হতেই হবে। কিন্তু কবিতা আসে মুক্ত প্রবাহের মতো, তখন অতো হিসেব কষলে চলে না।

আমার মনে হয়, আপনি কবিতায় সমস্যার সমাধান বের করে আনেন, আর সেটিকে আরো নাটকীয় করে উপন্যাস করে তোলেন।

অ্যাট্উড : আমার কাছে কবিতার সৃষ্টিতত্ত্ব হলো, একগুচ্ছ শব্দ। আমি মনে করি না যে, আমি কবিতায় সমস্যার সমাধান বাতলে দিই। আমি সমস্যাগুলোকে উন্মোচন করি মাত্র। তারপর উপন্যাসে সমস্যাগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে একটা গন্তব্যে আসার চেষ্টা করি। তবে কবিতা লেখার সময় সেই চিন্তাটা করি না। আমি তখনও জানিই না যে, এই কবিতায় হয়ত আমাকে পরবর্তী উপন্যাসের দোরগোড়ায় নিয়ে যাবে। কেবলমাত্র কবিতা শেষ করার পরেই আমি বলতে পারি—ঠিক আছে, এখান থেকে আরো এগুনো যায়।

লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি কি সবসময় আলাদা হয়? লেখকদের দেখাতে কোনো ঐক্য থাকে কিনা?

অ্যাট্উড : এটা নির্ভর করে একটা বিষয়কে আমরা কতটা শব্দ দিয়ে বা কতভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখি তার ওপর। যেমন, এস্কিমোর ইনুইট জনগোষ্ঠীরা স্নোকে বাহান্ন নামে ডাকে। অর্থাৎ সেখানে বাহান্না পদের স্নো আছে। আবার ফিনিসে নারী-পুরুষের জন্যে আলাদা সর্বনাম (‘হি’ এবং ‘সি’, উল্লেখ্য বাংলা ভাষাতেই সর্বনাম বিভেদ নেই) নেই। যদি তুমি ফিনিস ভাষায় উপন্যাস লিখতে যাও, তোমাকে শুরুর দিকেই জেন্ডারটা ঠিক করে দিতে হবে—হয় নাম দিয়ে অথবা জেন্ডারভেদে বিশেষ কার্যকলাপ দিয়ে।

আমি এই প্রশ্নের ঠিকঠিক উত্তর দিতে পারবো না, কারণ আমি জানি না অন্যরা বিশ্বকে কিভাবে দেখেন। আর লেখকদের ভেতর মিলের বিষয় এটাই যে, তারা লেখেন। যে-কারণে তারা সকলেই শব্দসন্ধানী। তবে প্রত্যেকে যখন লেখেন তখন আলাদা হয়েই লেখেন, কারণ তাদের সকলের একটা নিজস্ব ‘গল্প’ থাকে, একটা নিজস্ব বর্ণনাভঙ্গি থাকে। আবার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকাশভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেÑ বিশ বছর বয়সে যেটা বিষাদময় মনে হয়, সেটি হয়ত চল্লিশে গিয়ে হাস্যরসাত্মক বা নস্টালজিয়া হয়ে ওঠে।

আপনি কি কখনো শব্দসংকটে ভোগেন?

অ্যাট্উড : প্রত্যেক লেখকই শব্দসংকটে ভোগেন, বিশেষ করে সিরিয়াস লেখকরা।

আপনার লেখায় এত বেশি সহিংসতা কেন? বিশেষ করে শারীরিক নিপীড়ন-

অ্যাট্উড : মানুষজন খুব আশ্চর্য হয়, একজন নারী লেখক সহিংসতা নিয়ে লিখছে দেখে। ধারণা করা হয়, নৃশংসতা বিশেষ করে শারীরিক নিপীড়ন পুরুষ মানুষের জগৎ। এটা নিয়ে নারীরা ভাববেন না বা নারীরা স্বভাবগতভাবেই এড়িয়ে যাবেন। অবশ্যই জেন অস্টিন বা জর্জ এলিয়টের চেয়ে আমি অনেক বেশি নৃশংসতা নিয়ে লিখি। তারা সেই সময় এ নিয়ে লেখেননি। চার্লস ডিকেন্স রক্তপাত নিয়ে লিখেছেন, সেটি তারা লিখলে কেউ প্রকাশ করতো না। এটা ঠিক, আমি নৃশংসতার মধ্যে বেড়ে উঠিনি। আমার চারপাশের মানুষজন ছিল অনেকবেশি সভ্য ও ভব্য। যখন আমি বিশে^র ব্যাপক অংশে পা রাখলাম, আমি লক্ষ করলাম, যারা নৃশংসতার মাঝে বাস করে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তাদের চেয়ে যারা তার বাইরে আছে তাদের জন্যে এটা অনেক বেশি ভীতিকর এবং সাংঘাতিক। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময়, যদিও আমাদের নিকটে কোনো যুদ্ধ হয়নি, তবুও যুদ্ধের সেই উৎকণ্ঠা-ভয়াবহতা এখনো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কানাডা ১৯৩৯ সালে যুদ্ধে অংশ নেয়, আমার জন্মের দুমাস আগে। মাথাপিছু মৃত্যুহার অনেক বেশি ছিল।

তারপরও আপনি এমন করে লেখেন যেন, আপনি নৃশংসতার মাঝে বেড়ে উঠেছেন।

অ্যাট্উড : আমি তো অনেককিছুই এমনভাবে লিখি যেন আমি তার মধ্যে দিয়ে গেছিÑ আমি তো ক্যান্সারের সঙ্গে বাস করিনি। আমি কখনো মোটা-স্বাস্থ্যবান ছিলাম না। আমার ভিন্ন ভিন্ন অনুভবশক্তি আছে। আগে থেকে ঠিক করা যায় না, কোন লেখায় কি ধরনের বিষয়বস্তু আসবে।

সেক্স নিয়ে লেখা সহজ কি-না?

অ্যাট্উড : সেক্স বলতে আপনি যদি কেবলই যৌনক্রিয়া বোঝান, তাহলে বলতে হয়, আমি ঐ বিষয়ে তেমন একটা লিখি না। তার বক্ষ ছিল আপেলের মতো—এভাবে বললে সবকিছু কেমন খেলো হয়ে যায়। সেক্স মানে তো কেবলই শরীরের বর্ণনা নয়, এর সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদেরও একটা সম্পর্ক আছে। তাই ঘরের আসবাব, অথবা গাছের পাতা—এসবের কথাও চলে আসে। সবকিছু মিলেই রোমান্সের একটা দৃশ্যপট তৈরি হয়।

মাতৃত্ব আপনাকে কতখানি পরিবর্তন করেছে?

অ্যাট্উড : আমি যখন লিখতে শুরু করি, তখন নারী লেখকদের অবস্থান নিয়ে আমি ভাবতাম—ভার্জিনিয়া উলফ আত্মহত্যা করেছেন, এমিলি ডিকিনসন এবং ক্রিস্টিনা রসেট্টির মতো লেখক একান্তবাসী হলেন, ব্রন্টিরা দুই বোন অল্পবয়সে মারা যান। তুমি আবার হ্যারিয়েট বেচার স্ট্রো বা মিসেস গাসকেল-এর ব্যাপারে ভাবতে পারো—তারা দীর্ঘজীবন বেঁচেছিলেন। জর্জ এলিয়ট কিংবা জেন অস্টেনের কোনো সন্তান ছিল না। এই সকল নারী লেখকের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, নারী লেখকদের জন্যে একইসাথে লেখালেখি এবং স্বামী-সন্তান-সংসার সামলানো কঠিন। কিছুদিন আমি ভাবলাম, সন্তান এবং লেখালেখি এর মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেবো। পরে আমি একটা সুযোগ নিলাম।

আপনার বেশিরভাগ লেখায় ভালোবাসা এবং ক্ষমতা সম্পর্কযুক্তÑ ভালোবাসা ক্ষমতার রাজনীতিতে একটা শক্তি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। আপনি কি নারী-পুরুষের সম্পর্ককে এর বাইরে আনা সম্ভব বলে মনে করেন না?

অ্যাট্উড : নারী-পুরুষের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ক্ষমতা স্তম্ভের অংশ বলেই আমি মনে করি। কারণ এই সমাজে নারীর চেয়ে পুরুষ বেশি ক্ষমতাধর। প্রেমের সম্পর্কে নারীকে তার সততা টিকিয়ে রাখার কথা ভাবতে হয়, পাশাপাশি তাকে তার নিজস্ব শক্তিও টিকিয়ে রাখতে হয়। ভালোবাসায় অহংবোধটা কমে যায়। ইতিবাচক দিক হলো, এ থেকে মহাজাগতিক বোধের সৃষ্টি হয়। আর নেতিবাচক দিক হল, আত্মসত্ত্বার শক্তি লোপ পায়।

নিজে ব্যক্তি হিসেবে কি ভাবি সেটা ভিন্ন কথা। আমি একজন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম। কিন্তু উপন্যাস তো কেবলই আত্মপ্রকাশ নয়। আমি উপন্যাসকে দেখি সমাজের ভেতর প্রবেশ করার পরিবহন হিসেবে। এটা হল ভাষা এবং বাস্তবতার একটা যোগসাধন। আমি যখন কোনো উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণ করি, সেই চরিত্র আমার নিজের জীবনের কথা বলতে আসে না। তাকে আমি সামগ্রিকতার মধ্যে তৈরি করি।

লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন কাজটা কি?

অ্যাট্উড : বই প্রচারণায় অংশ নেয়া—সাক্ষাৎকার দেয়া। সবচেয়ে সহজ হল লিখে যাওয়া। সহজ বলে আমি বলতে চাচ্ছি না যে, লেখালেখিতে কোনো কঠিন সময় যায় না, হতাশা থাকে না।

আপনি কিভাবে সম্পাদকদের সঙ্গে সম্পাদনার কাজটি করেন?

অ্যাট্উড : নিজে একসময় সম্পাদক ছিলাম, তাই নিজের কাজ আমি নিজেই সম্পাদনা করতে পছন্দ করি। আমি কাউকে দেখানোর আগে নিজেই ভালো মতো দেখে নিই। তবে কিছু কিছু বিষয় সম্পাদককে দেখিয়ে ঠিক করে নিই। একজনের সম্পাদকের কাছে তোমার যেটা চাওয়ার থাকতে পারে সেটা হলো, তোমার কাজের প্রতি তার আগ্রহ এবং ভালোবাসা। এর মূল্য তুমি টাকা দিয়ে শোধ করতে পারবে না।

আমি দেখেছি, আপনার চিন্তার ক্ষেত্রে অর্থ একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে চলে আসে। আপনি কি এভাবেই সবকিছু দেখেন?

অ্যাট্উড : তুমি যখন অর্থকষ্টে থাকবে তখন তোমাকে সেটা করতে হবে। আমি একটা সময় এতটা সচ্ছল ছিলাম না। তবে আমার দারিদ্র্য তথাকথিত দরিদ্রতার মতো ছিল না। কারণ, আমার পরিবার বনের মধ্যে বাস করতো, সেখানে বোঝা মুশকিল তুমি ধনী না গরিব। আমাদের বেঁচে থাকার জন্যে যা যা দরকার তার সবই ছিল। আমরা নিজেরা সবজি উৎপাদন করে আমাদের চাহিদা মেটাতাম। আমরা এমন এক সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ছিলাম যে, এটা তখন ধর্তব্যে আনার মতো বিষয় ছিল না। এরপর আমি যখন বাইরের জগতে পা রাখলাম, আমাকে নিজের ভরণপোষণের দিকে গুরুত্ব দিতে হল। আমাকে আর্থিকভাবে স্বাধীন করে তোলা হল। অর্থ নারীদের জন্যে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তুমি ভাবতেই পারবে না অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতার বিষয়টি তোমার চিন্তা-চেতনার জায়গাটা কতটা বদলে দিতে পারে।

আপনি কি সবসময় প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন?

অ্যাট্উড : আমি বেড়ে উঠেছি জঙ্গলে—পরিবার ছাড়া সব ধরনের সামাজিক-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে। যেভাবে অন্য ছেলে-মেয়েরা শিশুকাল থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক বোধের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে, সেভাবে প্রতিষ্ঠানকে বুঝে ওঠার বা মানিয়ে নেয়ার সুযোগ আমার হয়নি।

আপনি শিরোনামটা কিভাবে ঠিক করেন?

অ্যাট্উড : তুমি যেমন রাস্তা-ঘাট দেখে দেখে আমার এখানে পৌঁছালে, আমি তেমন আমার উপন্যাস লিখতে লিখতে শিরোনামে পৌঁছাই। তবে কখনো কখনো লেখা শুরু করার আগেই নামটা চলে আসে—যেমন, ‘দ্য ইডিবল ওম্যান অ্যান্ড লেডি’ বইয়ের ক্ষেত্রে হয়েছে। কখনো কখনো তুমি হয়ত অন্য একটা দিকে মনোনিবেশ করেছ, আর তখনই অকস্মাৎ শিরোনামটা তোমার মনের মধ্যে চলে আসলো। ‘বডিলি হার্ম’-এর ক্ষেত্রে আমি বসে থেকে অন্যসব কাগজপত্র ঘাটছিলাম, তখনই নামটা মনে এলো। ‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’ যখন শুরু করি, তখন এটার নাম ছিল ‘অফরেড’। একশ দশ পৃষ্ঠায় গিয়ে নামটা বদলালো। আমি তখন বাইবেল পড়ছিলাম, ‘জেনেসিসি ৩০’ থেকে মূল শিরোনামটা নিলাম। আমি নিজেও মনে করি, শিশুকালে যে শব্দগুলোতে আমার খটকা লাগতো তার মধ্যে হ্যান্ডমেইড, ফুটম্যান শব্দগুলো ছিল। এগুলো খুব বাজে শব্দ।

আপনি কি আপনার অতীতের লেখাগুলো পড়েন? সুযোগ পেলে কোনো পরিবর্তন করবেন কিনা?

অ্যাট্উড : ঠিক পরিবর্তন করবো না, যেভাবে ফটো ব্রাশ করে সেভাবে হয়ত একবার ঝেড়ে রাখতে চাইবো। আমি নিজের লেখা খুব বেশি পড়ি না। মাঝে মধ্যে নিজের পুরানো কোনো লেখা হাতে চলে এলে খুব অপরিচিত মনে হয়। একটু সময় লাগে বুঝে উঠতে। আমি সবসময় বর্তমানের লেখালেখি নিয়েই থাকতে চাই।

আপনার লেখক জীবনে স্মরণীয় কোনো মুহূর্ত?

অ্যাট্উড : প্রথম কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর আমি খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম। এরপর অনেক লেখাই তো প্রকাশিত হলো, কিন্তু সেই মুহূর্তটি ভুলবার নয়।

আমি আরো একান্ত কোনো অনুভূতির কথা জানতে চাচ্ছিলাম?

অ্যাট্উড : আচ্ছা, আমি তখন কোপেনহেগেনে ছিলাম। রাস্তায় একা একা হেঁটে যাচ্ছিলাম। ডেনামার্কের সঙ্গে গ্রীনল্যান্ডের একটা ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। এখানে ইনুইট জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশের বাস। সেদিন রাজপথে ইনুইটরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নাচানাচি হৈহুল্লোড় করছিল। তারা মুখে আঁকাআকি করে পুরাণের দৈত্য-দানবের মুখোশ পরেছিল। হঠাৎ করে এক প্রেতাত্মা আমার দিকে এগিয়ে এসে মুখের মুখোশ তুলে বলল, আপনি কি মার্গারেট অ্যাট্উড? আমি হ্যাঁ বললে সে বলল, আমি আপনার লেখা পছন্দ করি। এটা বলেই সে তার মুখোশ পরে উল্লাস করতে করতে জনসমুদ্রে হারিয়ে গেল।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





মন্তব্য করুন

আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন করুন: